বড় ছাড়েও ক্রেতা নেই: ঢাকায় ঈদের কেনাকাটায় মন্থর গতি
রাজধানীর প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, এবারের ঈদের কেনাকাটার চিত্র বেশ ধীর গতির। বিক্রি কম হওয়া, ক্রেতাদের ব্যয় করার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং সন্ধ্যার পর লোকসমাগম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
দোকানের সামনে ঝুলছে 'ফ্ল্যাট ৫০% ছাড়'-এর জমকালো ব্যানার। সুসজ্জিত পোশাকের র্যাকগুলোর পাশে অলস দাঁড়িয়ে আছেন বিক্রয়কর্মীরা। এক সময় ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকা ঢাকার শপিং মলগুলোতে এখন জনসমাগম লক্ষণীয়ভাবে কম। দেশের বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো আকর্ষণীয় সব ছাড় দিলেও এবারের ঈদের কেনাকাটায় ক্রেতাদের উপস্থিতি আশানুরূপ নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, এবারের ঈদের কেনাকাটার চিত্র বেশ ধীর গতির। বিক্রি কম হওয়া, ক্রেতাদের ব্যয় করার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং সন্ধ্যার পর লোকসমাগম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও অনেক বিক্রেতা লোকসান এড়িয়ে চলছেন, তবে মুনাফার প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি সরাসরি ভোক্তা আচরণ পরিবর্তন এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের প্রতিফলন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেইলি রোডের 'ইনফিনিটি' শোরুমের ম্যানেজার শাহরিয়ার সুলতান বলেন, এবারের ঈদের বাজার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তিনি বলেন, 'গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতা অনেক কম। দিনের তুলনায় সন্ধ্যায় ভিড় কিছুটা বাড়লেও বিক্রি খুব বেশি লাভজনক নয়। আমাদের এই শাখাটি তুলনামূলক ভালো করলেও অন্যান্য শোরুমের অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়।'
ব্যবসায়ীদের মতে, এক সময় ঈদের কেনাকাটা মানেই ছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং গভীর রাত পর্যন্ত ভিড়। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মানুষ এখন অনেক ভেবেচিন্তে খরচ করছে।
আর্টিজান'-এর ভেতরে পাঞ্জাবি ও উৎসবের পোশাকগুলো সাজানো থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা হাতেগোনা। ম্যানেজার দীপ্ত দাস এই মন্দার পেছনে পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক উভয় কারণকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় প্রচণ্ড গরম এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই ক্রেতা কমে যাওয়ার মূল কারণ। কয়েক দিন আগেও রাত ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার নির্দেশনা ছিল, ক্রেতারা এখনো সেই রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি।'
তিনি আরও জানান, বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পরেও রাত ৮টার পর ক্রেতার প্রবাহ গত বছরের তুলনায় অনেক কম, যা ঈদের কেনাকাটার চিরাচরিত ছন্দকে ব্যাহত করছে।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে 'জেন্টল পার্ক'-এর বিক্রয়কর্মী জিসান একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, 'রাতে বিক্রি কিছুটা বাড়লেও আমাদের রাত ১০টার মধ্যে সব বন্ধ করে দিতে হয়। অধিকাংশ ক্রেতা সন্ধ্যার পর আসেন। ঈদের সময় কেনাকাটার সময়সীমা বাড়ানো হলে সবার জন্যই ভালো হতো।'
বিক্রেতারা লক্ষ্য করেছেন যে, গত বছরের তুলনায় বেশি ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও মানুষ উৎসবের কেনাকাটার চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিছু ক্রেতা শুধু দাম যাচাই করতে আসছেন, আবার অনেকে ঈদের একদম আগমুহূর্তে আরও বড় ছাড়ের আশায় কেনাকাটা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক চাপ ও ভোক্তার আচরণ পরিবর্তন
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেনাকাটার এই মন্থর গতি মূলত দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের প্রতিফলন। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, 'ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক কাজ করছে। মানুষ অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ১২ মাস ধরে আমদানি-রপ্তানিও চাপের মুখে রয়েছে।'
বিপণন কৌশল ও পরিবর্তিত অগ্রাধিকার
বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রচারণার ব্যর্থতা নয়, বরং ক্রেতাদের অগ্রাধিকার এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনের বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুবিনা খন্দকার বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল মূল্যছাড় দিয়ে চাহিদা বাড়ানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, 'মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন একটি বড় ফ্যাক্টর। অনেক ক্রেতা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রতি অনুগত থাকেন যেখানে ছাড় খুব একটা কার্যকর হয় না। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন নতুন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সহজলভ্যতা প্রথাগত রিটেইল বাজারের ধরনে পরিবর্তন এনেছে।'
জীবনযাত্রার ব্যয় ও শৌখিন কেনাকাটায় কাটছাঁট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম পরিবারগুলোকে শৌখিন কেনাকাটা কমাতে বাধ্য করছে।
তিনি বলেন, 'নিত্যপণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে যে পরিবারগুলো ঈদের পোশাকের মতো অতিরিক্ত কেনাকাটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ব্র্যান্ডগুলো আকর্ষণীয় ছাড় দিলেও ক্রেতারা এখন অনেক বেশি সতর্ক।'
তিনি আরও জানান, কেনাকাটার সময়সীমা সীমিত হওয়া এবং অনলাইন কেনাকাটার প্রসারও শপিংমলগুলোতে ভিড় কমার অন্যতম কারণ।
ঈদুল আযহার প্রেক্ষাপট ও বাজার বাস্তবতা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আযহার সময় ক্রেতাদের অগ্রাধিকার ভিন্ন থাকে। 'সেইলর'-এর ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মো. সাদেকুজ্জামান খান বলেন, কোরবানির ঈদে মানুষের মূল খরচ হয় পশুর হাটে।
তিনি বলেন, 'ঈদুল আযহার সময় মানুষ স্বভাবতই মিতব্যয়ী হয় কারণ তাদের প্রধান খরচ থাকে কোরবানি কেন্দ্রিক। ফলে ফ্যাশন বা লাক্সারি পণ্যগুলো তালিকার দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়। এই সময়ে শুধু ছাড় দিয়ে বিক্রি বাড়ানো কঠিন।'
তিনি আরও বলেন, 'আগে সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধের যে নিয়ম ছিল, তা খুচরা বিক্রিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। তবে ১২ মে'র পর সময়সীমা শিথিল হওয়ায় সেইলরের বিক্রিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, যদিও সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।'
তবে সাদেকুজ্জামান ক্রেতাদের মানসিকতায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'ক্রেতারা এখন শুধু ছাড়ের পেছনে ছোটেন না। তারা নতুনত্ব, ডিজাইন, উন্নত কাপড় এবং নতুন কালেকশনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দামের চেয়ে পণ্যের মান এবং ব্র্যান্ডের অভিজ্ঞতাই এখন ক্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।'
ঢাকার ব্যবসায়ীদের জন্য আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত হবে এবারের ঈদ মৌসুম কি কিছুটা পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে শেষ হবে নাকি মন্দার এই ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে আপাতত ঝলমলে ব্যানার আর আলোকসজ্জার নিচে ঢাকার ক্যাশ কাউন্টারগুলো বড় অংকের ছাড়ের বিজ্ঞাপন সত্ত্বেও বেশ নীরব।

মন্তব্যসমূহ