ফারিয়া বাশারের গল্প: একটি চোখ, একটি পা
কালে ঘুম ভাঙতেই কম্বলটা সরালাম আর দেখলাম, আমার একটা পা শুকিয়ে কুঁচকে কালো হয়ে হাঁটুর ঠিক নিচ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে আমার ভেতরে ঘৃণা আর বিস্ময়ের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হলো। ঘৃণা—কারণ দৃশ্যটা ভয়াবহ; আর বিস্ময়—কারণ নিজের শরীরের এই আত্মবিনাশের ক্ষমতা দেখে আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম।
ফারিয়া বাশার একজন বাঙালি বংশোদ্ভূত লেখক, যিনি ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ থেকে স্নাতক এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পড়ার প্রতি তার আগ্রহ অনেকদিনের হলেও, লেখালেখি শুরু করেছেন তুলনামূলকভাবে সম্প্রতি। ২০২৫ সালে তিনি এশিয়া অঞ্চল থেকে কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজে ভূষিত হন। তার গল্পের নাম An Eye and a Leg। সে বছর রেকর্ডসংখ্যক ৭,৯২০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্য থেকে যে পাঁচজন লেখক নির্বাচিত হয়েছিলেন, ফারিয়া বাশার তাদের একজন। এছাড়াও, তিনিই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এশিয়া অঞ্চল থেকে এই পুরস্কার অর্জন করেছেন।ফারিয়া বাশার বলেছেন, “আমি মনে করি, বিভিন্ন লেখালেখির প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও বিষয়গুলোকে কিছুটা হালকা বা সংযতভাবে উপস্থাপন করার একটি অলিখিত চাপ লেখকের ওপর থাকে। কিন্তু কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশীয় বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে আমি পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, এবং এটি আমার গল্প ও আমি যে বার্তাটি দিতে চেয়েছিলাম, তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।” -অনুবাদক
মূল লেখা: ফারিয়া বাশার
অনুবাদ: নীলিমা রশীদ তৌহিদা
আমার চোখটি যখন হঠাৎ করে কোটর থেকে খসে পড়ল, আমি চিৎকার করে মাকে ডাকলাম—
“মা! মা! আমার কী হচ্ছে?” মা কিছুটা বিচলিত হয়ে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন। তার হাতে তখনও পেঁয়াজ কাটার ছুরি। “কী হয়েছে?”—বিরক্ত স্বরে বললেন তিনি, যেন আমি তার কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। তারপর এক মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকাতেই থমকে গেলেন তিনি। আমার চোখের গোলকটা সেখানেই পড়ে আছে। “হায় খোদা, মাফ করো!”
নিজের হাতে সেটা স্পর্শ করার সাহস মায়ের হলো না। দুটি চামচ দিয়ে আমার পড়ে যাওয়া চোখটা মেঝে থেকে তুলে নিলেন তিনি। আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না, চোখটা নিয়ে কী করা উচিত। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষমেশ সেটাকে পোলাওয়ের জন্য রাখা বরফে জমাট বাঁধা মটরশুঁটির ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখা হলো। আর সারাক্ষণ আমি চোখের সেই ফাঁকা গর্তটা এক হাত দিয়ে ঢেকে রাখলাম। আমরা বাবাকে ফোন করলাম। তিনি তখন অফিসে। মা ফোন স্পিকারে রাখলেন, যাতে আমি নিজেই ঘটনাটি বলতে পারি।
বাবা, আমার চোখ পড়ে গেছে!”—আমি তাকে বললাম। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলেন। মা তখন প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থায়—ঘরের মধ্যে এদিক-সেদিক হাঁটছেন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, চেনা-পরিচিত সবাইকে ফোন করছেন—যদি কেউ কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে, এই আশায়।
সেদিনের শুরুটা ছিল অন্য সব সাধারণ দিনের মতোই। সবার আগে ঘুম থেকে উঠেছিলেন বাবা। বরাবরের মতোই বাথরুমের বেসিনের ওপর তার জোরে জোরে গলা খাঁকারি দেওয়ার শব্দে বাড়ির বাকি সবাইও জেগে উঠল। মা একটু পরেই উঠে রান্নাঘরে গেলেন—গত রাতের ডাল গরম করতে আর নতুন করে রুটি বানাতে। মাঝে মাঝে খুব ক্ষুধা লাগলে আমি ভাজা ডিম চাইতাম। সেদিন তাও চাইনি।
আমার মনে আছে বাবাকে দেখলাম রিকশা থামিয়ে উঠে বসলেন এবং কাজে চলে গেলেন। তারপর আমি হারমোনিয়ামে গান ধরলাম। মায়ের মন ভালো ছিল, তিনি এসে কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে গান শুনলেন। তিনি সব সময় বলতেন, আমার গান শুনলে তার মন শান্ত হয়। যদিও আমার যতটা মনে পড়ে, কয়েকবার এই গলার স্বরই তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। কয়েক ঘণ্টা পর একজন ছাত্রী আসার কথা ছিল। আমি অপেক্ষা করছিলাম আর ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
বাবার সঙ্গে আমরা পারিবারিক ডাক্তারের কাছে গেলাম—একজন শক্তপোক্ত, বাচাল মানুষ, যাঁর কাছে আমরা আমার বারো বছর বয়স থেকে যাই। যতদূর জানি, তিনি বাবার দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও বটে—হয়তো কোনো চাচাতো-ফুফাতো ভাই-টাই হবে। আমি ঠিক জানি না। তারা দুজন আমার অবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, মাঝে মাঝে আত্মীয়দের খবর বা পুরোনো বিষয় নিয়ে টুকটাক আলাপও চলছিল। তবে আমার বিষয়টাই ছিল মুখ্য। আমি চুপচাপ সব শুনছিলাম। মটরশুঁটির ব্যাগে করে মা আমার সেই পড়ে যাওয়া চোখটিও নিয়ে এসেছেন—ব্যাগ থেকে টপটপ করে মেঝেতে পানি ঝরছে।
“আমি জানি ঠিক কী হয়েছে!” ডাক্তার বলে উঠলেন। “ওকে অবশ্যই বিয়ের বাজারে নিতে হবে!”
সবাই আমার দিকে তাকাল। “বাজারে?” মা অবাক হয়ে বললেন। মৃদু একটা শব্দ শোনা গেল ‘’কিন্তু’’…
ডাক্তার আঙুল তুলে আমার দিকে ইশারা করে বললেন—“তোমার তো মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। এই বয়সী মেয়েদের এমনই হয়, বুঝলে! যারা পড়াশোনা, চাকরি বা অন্য কোনো কারণে বিয়ে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে না, তারা একসময় পচতে শুরু করে। তাই বয়স আরও বেড়ে যাওয়ার আগেই ওকে বিয়ের বাজারে নিয়ে যাও।” এসব বলে তিনি বাবার দিকে তাকালেন।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
“আমাদের হাতে কত সময় আছে?”
ডাক্তার একটু হেসে বললেন,
“আরোও সময় চান? চৌত্রিশ তো হয়েই গেছে! আর কত? আমার তো মনে হয় না, আপনাদের হাতে আর খুব বেশি সময় আছে।”
আমি বললাম,
“আর আমার চোখটা? ওটা কি আবার লাগানো যাবে?”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“না, দুঃখিত।”
ডাক্তার আমাকে একটি আই-প্যাচ দিলেন এবং জায়গাটা পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দিলেন। ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার পথে প্রায় পুরোটা সময় বাবা চুপ ছিলেন। আমাকে গাড়ির বাঁ দিকটায় বসতে দেওয়ার জন্য আমি মাকে অনুরোধ করলাম, যাতে আমার অন্য চোখ দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে পারি। ভীষণ উৎকণ্ঠায় মা বাবাকে বললেন, “কিছু তো বলো! মেয়েটা তো একদম ভেঙে পড়ছে।” বিরক্তির স্বরে বাবা বললেন, “ডাক্তার যা বলেছে শুনেছ তো! ওর তো বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। আমরা বোধহয় দেরি করে ফেলেছি। অনেক আগেই পাত্র খোঁজা উচিত ছিল।” “এখনও তো খোঁজা যায়,” বললেন মা।
“পাগল হয়েছ? একচোখা মেয়েকে কে নেবে! ডাক্তারের কথাই ঠিক—আমাদের বিয়ের বাজারেই যেতে হবে,” বললেন বাবা।
সেদিন রাতে মা আমার পাশে ঘুমালেন, যদি আবার কিছু ঘটে! অস্থিরতায় আমি বারবার তার দিকে ফিরছিলাম। এয়ার কন্ডিশনের মৃদু আলোয় এক চোখ দিয়েও তার অস্পষ্ট অবয়বটা দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলেন, একবারও আমার দিকে ফিরে তাকালেন না। সেই রাতটা ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। অদ্ভুতভাবে আমি একসঙ্গে কাঁপছিলাম আবার ঘামছিলামও। শীতের মোটা কম্বল জড়িয়ে থাকলেও হাড়ের একদম ভেতর পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে যাচ্ছিল। মনে হলো মা-ও জেগে আছেন।
“মা, এখন আমার কী হবে?”
তিনি আমার হাত ধরলেন।
এত চিন্তা করিস না। তোর বাবা আগামীকাল অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। সকালে আমরা ভাবব কী করা যায়।”
“তোমরা কি সত্যিই আমাকে বাজারে নিয়ে যাবে?”
“জানি না রে।”
“আমি কি এখনও হারমোনিয়াম বাজাতে পারব, মা?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জানি না।”
সকালে ঘুম ভাঙতেই কম্বলটা সরালাম আর দেখলাম, আমার একটা পা শুকিয়ে কুঁচকে কালো হয়ে হাঁটুর ঠিক নিচ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে আমার ভেতরে ঘৃণা আর বিস্ময়ের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হলো। ঘৃণা—কারণ দৃশ্যটা ভয়াবহ; আর বিস্ময়—কারণ নিজের শরীরের এই আত্মবিনাশের ক্ষমতা দেখে আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমাদের ঘরের টিকটিকিগুলোর কথা মনে পড়ল। প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগে মা একবার ড্রয়িংরুমের দেয়ালে বসে থাকা একটা টিকটিকির দিকে বই ছুঁড়ে মেরেছিলেন। তার লেজটা কেটে গিয়েছিল। নিজের জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, “এইবার তোকে পেয়েছি!” তিন সপ্তাহ পর আমি সেই টিকটিকিটিকে আবার দেখলাম। তার শরীরে নতুন করে লেজ গজাতে শুরু করেছে, আর সে সেটি নিয়েই দেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা, আমার পাটাও কি এভাবে আবার ফিরে আসবে—নতুন করে?
বাবা-মা যখন আমার পচে যাওয়া মৃতপ্রায় পা টিকে দেখলেন, আমার অবস্থার ভয়াবহতা নিশ্চয়ই তাদের কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাবা খুবই অস্বাভাবিক একটা কাজ করলেন; বরাবর খেতে খুব ভালোবাসা এই মানুষটা, নাশতা না করেই আমাদের পারিবারিক ডাক্তারকে বাড়িতে ডাকার ব্যবস্থা করলেন। মা ফোন করলেন নানিকে। ঘন্টাখানেক পরে, সদ্য বানানো সমুসা নিয়ে তিনি আমাদের বাড়িতে হাজির হলেন।
“আহারে, কী অবস্থা তোর!”—বিছানার পাশে বসে বললেন নানি। “নিজেকে দেখছস?”
আমি হালকা স্বরে বললাম,
“নানি, তুমি কেমন আছো?”
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন,
“এখন তোরে বিয়ে করবে কে?”
তারপর মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“সব তোর দোষ।”
মা মাথা নিচু করে রইলেন। আমি নানির আনা কাগজের ব্যাগ থেকে একটা সমোসা তুলে নিলাম। এটা আমার সবচেয়ে প্রিয়—ভেতরে গরুর কিমা ভরা, বাইরেটা একদম মুচমুচে।
আম্মা, আমরা তো জানতাম না—”
“আম্মা-আম্মা করিস না!”—নানি ধমক দিলেন।
“আমার ভাসুরের মেয়ের কী হইছিল তা আমি তোরে বলি নাই? সে-ও মেয়েরে বিয়ে না দিয়ে পড়ালেখা করাইছে, কাজ-কর্ম করতে দিছে—”
“আম্মা, আমি কী করে—”
“আর তারপর মেয়েটা পইচা গেল! বিয়ার বয়স পার হইয়া গেল, যেমনটা এখন তোর মেয়ের হইব! তোরা এই আধুনিক মেয়েরা, তোদের আধুনিক চিন্তাভাবনা! দেখলি তো, এইসব এখন কোথায় আইনা ফেলছে তোদের! একচোখা, একপা-ওয়ালা মেয়েরে বিয়ে করবে কে?”
আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে পড়াশোনা আর কাজ করার মধ্যে “আধুনিক” হওয়ার কী এমন ব্যাপার আছে। আমার জীবনের পুরুষরা তো এসব দশকের পর দশক ধরে করে আসছে এবং তাদের অনেকেই ছিল ভীষণ রক্ষণশীল, পুরোনো ধাঁচের। আমি চুপচাপ সমুসা খেতে লাগলাম। খুব ক্লান্ত লাগছিল। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো—তারা মা-মেয়ে এমন ভাবে এইসব কথাবার্তা বলছিল যেন আমি সেখানে নেই। মনে হচ্ছিল, এখানে আমার আসলে কিছুই করার নেই।মা চিৎকার করে উঠলেন—“ওর অনেক স্বপ্ন ছিল! দারুণ হারমোনিয়াম বাজাত ও, আর এখনও বাজায়! ও তো ভালোই করছে—টিভিতে বাজিয়েছে, এমনকি রেডিওতেও। অন্যদের শিখিয়ে ভালোই উপার্জন করে। মানুষজন ওর কাছে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে হারমোনিয়াম শেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে থাকে। আম্মা তুমি জানো এসব? এসবই হয়েছে আমি তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছি বলে। আমি ওকে হারমোনিয়াম শেখার ক্লাসে ভর্তি করেছি, প্রতি সপ্তাহে নিজে নিয়ে গিয়েছি! ওর বাবা তেমন কোনো সাহায্যই করেনি…”ঠিক তখনই বাবা ঘরে ঢুকলেন। “আম্মা, আপনি এসেছেন! অনেক ধন্যবাদ,” তিনি বললেন। “আপনাদের ঝগড়া এখনো শেষ হয় নি ? ডাক্তার সাহেব আসছেন।” বাবা আমার দিকে তাকালেন। আমি দেখলাম, তিনি আমার চোখে চোখ রাখতে পারছেন না। “কালই আমরা ওকে বিয়ের বাজারে নিয়ে যাব।” বললেন, তিনি।ডাক্তারসাহেব প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরি করে এলেন। এতে আমি খুব একটা অবাক হইনি, কারণ হাসপাতালে আমরা যখনই তার কাছে যেতাম, তিনি আমাদের এভাবেই অপেক্ষায় রাখতেন। তিনি আমার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকালেন, যেখানে করুণার সঙ্গে মিশে ছিল এক ধরনের আত্মতুষ্টি। যেন তিনি বলতে চাইছেন—“আমি তো আগেই বলেছিলাম”—কিন্তু বলতে পারছেন না, কারণ তা বললে তাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতো। ডাক্তার আমাকে একটি কৃত্রিম অঙ্গ পরিয়ে দিলেন, কিছু ওষুধ লিখে দিলেন, এবং আমার বাবা-মাকে জানালেন—আর কোনো বিলম্ব করা যাবে না। আমাকে এখনই বিয়ের বাজারে নিতে হবে; নইলে এই দ্রুত অবনতি সম্ভবত আগামী দুই দিনের মধ্যেই আমার মৃত্যু ডেকে আনবে। মা আর নানি কান্না ও আতঙ্কে ভেঙে পড়লেন। আর বাবা নিঃশব্দে, স্থিরভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। আর আমি? আবার হাঁটতে পারছিলাম বলে আমি খুশি ছিলাম, যদিও মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছিলাম।পরদিন সকালে (সৌভাগ্যক্রমে আর কোনো অঙ্গ খসে পড়েনি), মা-বাবা আমাকে বিয়ের বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। এর আগে কিছুটা প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে আমি নিজেই বাথরুমে গিয়ে গোসল সারলাম। আই-প্যাচ খুলে আমি কুসুম গরম পানি দিয়ে আমার মুখ থেকে গত দুই দিনের বিষণ্ণতা ধুয়ে ফেললাম। গোসল শেষে মা আমার চুল মুছে দিয়ে সুন্দর করে আঁচড়ে দিলেন, মুখে ভারী মেকআপ লাগালেন এবং তার সবচেয়ে ভালো শাড়িটা আমাকে পরিয়ে দিলেন। বাবা ফার্মেসি থেকে আমার জন্য একটা নতুন আই-প্যাচ কিনে আনলেন।বিয়ের বাজার! নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি এমন এক জায়গা যেখানে শহরের অবিবাহিত নারীরা নিজেদের সম্ভাব্য পাত্রদের সামনে প্রদর্শনের জন্য হাজির হন। আয়োজনটি হতো একটি কনভেনশন সেন্টারে। সেখানে নারীদের মূল্য নির্ধারণ করা হতো, তারপর বড়, বিস্তৃত ফ্লোরজুড়ে নির্দিষ্ট বুথে বসানো হতো। আর পুরুষরা সেখানে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত, কথা বলত, পর্যবেক্ষণ করত এবং শেষ পর্যন্ত নিজেরাই বেছে নিত তাদের জীবনসঙ্গী। বিয়েগুলো সেখানেই সম্পন্ন হতো; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেসব পুরুষ একা প্রবেশ করতেন, তারা নিজেদের পছন্দমতো একজন স্ত্রী নিয়েই বের হতেন। অধিকাংশ মানুষই—হোক সে প্রদর্শিত নারী বা ঘুরে বেড়ানো পুরুষ—নিজেদের পরিবারের সঙ্গে আসতেন। পরিবারই তখন তাদের সন্তানদের জন্য সঙ্গী যাচাই, দরকষাকষি এবং চূড়ান্ত নির্বাচন পর্যন্ত সবকিছুতে সহায়তা করত।আমি বিয়ের বাজারের গল্পগুলো বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছিলাম, কিন্তু সেগুলো সবসময়ই আমার জন্য দূরের কিছু ছিল—যেন সেগুলো আমার জীবনের বাইরে অন্য কোনো বাস্তবতার অংশ। আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে একদিন আমি নিজেই সেই বাজারের একটি পণ্য হয়ে উঠব। এক অর্থে আমি সম্ভবত কিছুটা বোকাই ছিলাম—ভাবতাম সময় তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না।বিয়ের বাজারে পৌঁছানোর পর বাবা-মা আর আমি বুথ বরাদ্দের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। আমি চারপাশে তাকালাম। আমার একমাত্র অবশিষ্ট চোখ দিয়ে যতটা সম্ভব দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম এই মহা বিনিময়ে অংশ নিতে আসা নারীদের এক বিশাল ঢল। সেখানে সব বয়সী নারী ছিল—একদম তরুণী, সদ্য যুবতী মেয়ে, মধ্যবয়সী নারী, বয়স্ক নারীরা, এমনকি অতিবৃদ্ধরাও। নিজের মতোই “মেয়াদ-ফুরিয়ে-আসা” কিছু নারীও চোখে পড়ল; তারাও চোখ ঢাকার জন্য আই-প্যাচ পরেছে, মাথার টাক ঢাকতে পরচুলা ব্যবহার করছে, কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছে। আমরা যখন লাইনের একদম সামনে পৌঁছালাম, টিকিট কাউন্টারের কর্মী আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল—“মেয়াদ ফুরোচ্ছে?”আমরা যখন লাইনের একদম সামনে পৌঁছালাম, টিকিট কাউন্টারের কর্মী আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল—
“মেয়াদ ফুরোচ্ছে?”
“হ্যাঁ,” বাবা বললেন। “তবে এখনও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। ও খুব ভালো হারমোনিয়াম বাজায়। ওকে মাঝে মাঝে টিভিতেও দেখা যায়।”
“বয়স?”
চৌত্রিশ। দেখে কিন্তু বোঝা যায় না, তাই না?”
কর্মীটি তরুণ—বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। সে বলল—
“তাহলে ওনার একটা ডিসকাউন্ট স্টিকার লাগবে।”
সে ডেস্ক থেকে উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা স্টিকার তুলে নিল, সেটার আঠা ছাড়িয়ে আমার কপালে লাগিয়ে দিল।
আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম—
“এতে কী লেখা আছে?”
বাবা বললেন—
আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমি একদম নিশ্চিত ছিলাম, আমার বাবা-মা আমার জন্য একটি দাম ঠিক করে ফেলেছেন; তবে সেই দামটা জানার কোনো আগ্রহই আমার ছিল না। আমার কপালে লাগানো এই ‘ডিসকাউন্টেড’ স্টিকার, আমার হারানো চোখ ও পায়ের কারণে মনে হচ্ছিল আমার মর্যাদা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এমন তো নয় যে সেগুলো একেবারেই হারিয়ে গেছে। আমি তো জানি ঠিকই সেগুলো কোথায় আছে—চোখটা এখনো মটরশুঁটির ব্যাগেই আছে, সেটাও আবার ফ্রিজারে রাখা; আর পা? ওটা তো আমার বাবা সরাসরি আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছেন। আমার বিভিন্ন বয়সের ছবি দিয়ে মা বুথটি সাজালেন। তিনি কিছু ভিজিটিং কার্ডও রাখলেন। বাবা কয়েকটি প্যামফ্লেট সাজিয়ে রাখলেন। সেখানে আমার বায়োডাটা ছিল—আমার পড়াশোনা, কাজের অভিজ্ঞতা ও সংগীত-সাফল্যের বিবরণ। আমি নিজে কখনো এমন কিছু তৈরি করেছি বলে মনে পড়ে না; তাই বুঝলাম এগুলো সবই আমার মা-বাবার তৈরি করা। তাদের চোখে আমার পরিচয়ের এক নিখুঁত দলিল।আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক করে সাজিয়ে, শাড়িটা ঠিকঠাক করে দিয়ে মা আমাকে বুথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি যেন এক ম্যানিকিন! কারণ ঠিক ওভাবেই আমাকে সাজানো হলো, যেভাবে একজন দোকানি ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য ম্যানিকিন সাজিয়ে থাকে।
ম্যানিকিনের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি দেখলাম, একের পর এক পুরুষ আমার বুথের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তারা আমার আই-প্যাচের দিকে একবার তাকিয়ে আবার দ্রুত সরে যাচ্ছে। আচ্ছা, এই বাজারের পর আমার জীবনটা কেমন হবে? আমি কি আর আগের মতো গান গাইতে পারব? হারমোনিয়াম বাজাতে পারব? যেমনটা আমি বাবার বাড়িতে থাকাকালীন পারতাম?
আমার চিরচেনা জীবনটা বোধ হয় আর থাকবে না। শিল্পচর্চা পড়ে থাকবে জীবনের ব্যাকসিটে। আমি নিজে একটি সম্পূর্ণ সত্তা না হয়ে হয়তো হয়ে উঠব আরেকটি সম্পূর্ণ সত্তার অর্ধাংশ—কারও স্ত্রী, এবং একদিন হয়তো সন্তানের মা—যে সন্তান আমার এই ভাঙা শরীরেই শেকড় গেড়ে বসবে।
হঠাৎ করেই আমি আবেগে ভেঙে পড়লাম। এক গভীর দুঃখ আমাকে গ্রাস করল, যেটা আমি এতদিন চেপে রেখেছিলাম। আর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমার পা—বিশেষ করে কৃত্রিম পা—ব্যথা করতে লাগল। কনভেনশন সেন্টারের ভেতরটাও ছিল ভীষণ গরম। আমি আর কান্না আটকে রাখতে পারলাম না। বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “কেঁদো না বলছি, তুমি তো পাত্রদের ভয় পাইয়ে দেবে।” মা নীরবে, খুব আস্তে আমার চোখের পানি মুছে দিলেন।
প্রথমে একজন ডাক্তার-প্রশিক্ষণার্থী বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে এলেন। বয়স ত্রিশ, এবং এর আগেও একবার বিয়ে করেছিলেন। তিনি বললেন, তার প্রথম স্ত্রী স্বাভাবিক কারণেই মারা গেছেন। যদিও সেই স্বাভাবিক কারণগুলো আসলে কী ছিল—তা কিন্তু একেবারেই পরিষ্কার নয়।
“আহা! আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তি দিক। তিনি কবে মারা গিয়েছেন?” মা জিজ্ঞেস করলেন।
“গত সপ্তাহে,” লোকটি উত্তর দিল।
দ্বিতীয় পুরুষটিকে বয়সে আমার বাবার চেয়েও বড় মনে হলো। আমার বাবার চেয়েও তার চুল বেশি সাদা ছিল। তিনি একবার আমার দিকে তাকালেন, মনোযোগ দিয়ে আমার বায়োডাটা পড়লেন, এবং দীর্ঘ সময় ধরে আমার কিশোরী বয়সের ছবিগুলো দেখতে থাকলেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী, এবং বছরের বেশিরভাগ সময়ই ভ্রমণে কাটান।
“কী ধরনের ব্যবসা?” বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
“ওহ, জানেনই তো—শিপিং আর ট্রেডিং।”
আমার বাবা আসলেই জানেন না।
তৃতীয় যে লোকটি আমার বুথে এলো, সে-ই প্রথম সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলল। মনে হলো, কোথাও আমাকে আগে দেখেছে—সম্ভবত টেলিভিশনে। কয়েকটি চ্যানেলের জাতীয় সম্প্রচারিত সংগীতানুষ্ঠানে আমি একসময় পারফর্ম করেছিলাম। সেখান থেকে বেশ ভালো পারিশ্রমিক পেতাম—কখনো সেই টাকা দিয়ে বাবা-মায়ের জন্য উপহার কিনতাম, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম রোড ট্রিপে।
“ডিসকাউন্টেড?—এ তো একেবারে হাস্যকর!” লোকটি বলল। “এখানে যে একজন তারকা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কি ওদের চোখেই পড়ে না?”
বাবা যেন কথাটা শুনে গলে গেলেন। উচ্ছ্বাস লুকোলেন না—“তাই তো বলছিলাম! ও কিন্তু একদম সত্যিকারের সংগীত প্রতিভা।”
পুরো তারকা আর হতে পারলাম কই!’’ বললাম আমি।
কৌতূহলী ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটি আমার দিকে তাকাল। “সময় কি তবে তোমাকে ধরেই ফেলল?”
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম।
“কখন যে এসে গেল, টেরই পাইনি।”
সে মৃদু হেসে বলল,
“তা তো হবেই। এক চোখে কি আর সবকিছু ঠিকমতো দেখা যায়?”
কথাটি শুনে খুব হাসলাম আমি। কেউ একজন আমার এই পরিস্থিতিকে এমন রসিকতার ভঙ্গিতে নিচ্ছে—এটা আমার বেশ ভালো লাগল, যদিও ভেতরে ভেতরে জানতাম, সব মিলিয়ে অবস্থাটা এখনো নিরাশাজনকই। আমি তার দিকে একটু ভালো করে তাকালাম। দেখতে ভালোই, হাসিটা খানিকটা বাঁকা কিন্তু কেমন যেন আপন মনে হয়। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে এমন কিছু জানে—যা অন্যরা জানে না।
সেদিন সন্ধ্যাতেই সে আমাকে কিনে নিল। সব আনুষ্ঠানিকতা খুব দ্রুত, নির্ঝঞ্ঝাটভাবেই শেষ হয়ে গেল—কিছু উচ্চারণ, কিছু স্বাক্ষর, আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার এক প্রতিশ্রুতি। নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে মা-বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। রাতের শেষে, অদ্ভুতভাবে, এই মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠলাম। সে আর তৃতীয় লোক না, এখন তো সে আমার স্বামী।শুরুর দিনগুলোতে একটা কোমলতা ছিল। আমি সেটাকে সেভাবেই মনে রাখতে চাই। তবে দাম্পত্য মানেই মানিয়ে নেওয়া। একসময় এসে টের পেলাম, এতদিন যা সহজ মনে হয়েছিল, তা আসলে কত বড় প্রাপ্তি—দুটি চোখ, দুটি পা, আর নিজের মতো করে বাঁচার সেই নির্ভার স্বাধীনতা। সত্যি বলতে, বাবা-মায়ের বাড়িতে আমি ভীষণ স্বচ্ছন্দে ছিলাম। কখনো ভাবিইনি, সেই স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে ছিল আমার মায়ের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি ছিলাম মুক্ত। দুপুরবেলা ইচ্ছে হলে বন্ধুর সঙ্গে পুরি-চা খেতে বেরিয়ে পড়তে পারতাম। শহরের অন্য প্রান্তে গভীর রাতে কোনো শিল্পানুষ্ঠান দেখতে যেতে চাইলে, বাবা—মুখ ভার করে হলেও আমার সঙ্গে যেতেন। রাত জেগে টেলিভিশনে নাটক দেখতাম, কিংবা হারমোনিয়ামে সুর তুলতাম। কেউ বাধা দিত না। আমার চারপাশে কিছু আপন মানুষ ছিল, যাদের সঙ্গে নির্ভার হয়ে বাঁচা যেত।
আমার জীবনটা একসময় পুরোপুরি আমার নিজের ছিল। আমি যেন এমন এক পাখি—যার খাঁচার দরজা কখনোই বন্ধ থাকত না। কিন্তু জীবনের এই প্রান্তে এসে টের পেলাম, সেই ছন্দ বদলে গেছে। আমি এখন একজন পুরুষের স্ত্রী। আমার সময় যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে।
আমার স্বামী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আমি ভেবেছিলাম, অন্তত এইটুকু মিল আমাদের আছে যে আমাদের দুজনের জীবনই শিক্ষার আলোয় আলোকিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিত পড়াতেন। আর হয়তো সেই কারণেই, তার চিন্তাভাবনাও ছিল ভীষণ গাণিতিক। সূত্র ধরে চলতেন তিনি। তার সঙ্গে একই সময়ে ঘুম থেকে উঠতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন করতে হবে, ঘর-দোর সবসময় টিপটপ থাকতে হবে—একটুও ময়লা যাতে না থাকে। আর যখন তিনি খাতা দেখতেন, কিংবা দীর্ঘ দিনের শেষে বিশ্রাম নিতেন, তখন ঘরের ভেতর একরকম বাধ্যতামূলক নীরবতা বজায় রাখতে হত। আমি বুঝতাম না, কীভাবে একজন মানুষ এমন কঠোর নিয়মের ভেতর দিয়ে জীবন কাটাতে পারে। তবে খুব দ্রুতই বুঝে গেলাম—এটা বোঝা আমার কাজ নয়।আগেই বলেছি, শুরুর দিনগুলো কিছুটা ভালো ছিল কারণ তখনো তিনি আমাকে কিছুটা ছাড় দিতেন—আমি তার স্ত্রী হয়ে ওঠার নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি আমাকে শেখাতেন—তার পছন্দের রান্না কীভাবে করতে হয়, তার কাপড় কীভাবে ধুতে হয়, আর রাতের বেলা যখন তিনি আমার কাছে আসতেন, তখন কেমন ব্যবহার করতে হয়।
বাবা-মা আমার অন্যসব জিনিসপত্রের সাথে হারমোনিয়ামটাও পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমার স্বামী আমাকে হারমোনিয়াম বাজাতে দিতেন। হারমোনিয়ামে সুর তুললে তিনি খুশিই হতেন। বিয়ের বাজার থেকে আমাকে বেছে নেওয়ার এটাও ছিল একটা কারণ।
আমি যখন গান গাইতাম, তিনি খুব প্রশংসা করতেন। বলতেন, আমার কণ্ঠ নাকি একেবারে পরীদের মতো। এক অর্থে, শুরুর সেই দিনগুলো ভালোই ছিল। তবে আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল না। ভালোবাসার মতো কিছু একটা ছিল।বিয়ের প্রায় ছয় মাস পর আমার কিছু শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন—আমি কি আবার হারমোনিয়াম শেখানোর ক্লাস শুরু করব কিনা? আমি বিষয়টা আমার স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করলাম। তিনি বললেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে তোই যথেষ্ট বড় বড় বাচ্চা সামলাই, বাড়িতে আর নতুন ঝামেলা দরকার নেই। আমাদের নিজের বাচ্চা হলে আলাদা কথা!” তার ইঙ্গিতটা আমি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলাম। বললাম, “আমি ওদের বাসায় গিয়ে শেখাতে পারি। আগেও তো এভাবেই করতাম।” তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “এই এক পা নিয়ে?”
আমি আর কিছু বললাম না। আমি ভাবলাম, আমার শিক্ষার্থীরা এমন একজন মানুষের সামনে থাকবে—যার ভেতরে কোনো আন্তরিকতা নেই—এটা আমি মেনে নিতে পারব না। তিনি মিথ্যা বলেননি। হ্যাঁ—আমার একটা পা নেই, একটা চোখও নেই। এক অর্থে আমি অসম্পূর্ণ।
কিন্তু তিনি তো সব জেনেই আমাকে বিয়ের বাজার থেকে বেছে নিয়েছিলেন। তাহলে এখন আমাকে কটাক্ষ করার মানে কী?
ধীরে ধীরে আমার মনে প্রশ্ন উঠতে লাগল—আমার মতো একজনকেই বা তিনি কেন বেছে নিলেন? তার তো কোনো দৃশ্যমান খুঁত নেই। বয়স খুব বেশি নয়—পঁয়ত্রিশ। (মেয়েদের ক্ষেত্রে ‘পয়ত্রিশ’ বয়স টা আবার খুব বেশি)। তিনি দেখতে ভালো। স্থায়ী চাকরি আছে। তার পরিবারকে আমি যতদূর দেখেছি তারা যথেষ্ট বিনয়ী ও আন্তরিক। তাহলে সে কেন আমার মত একজন ‘অর্ধেক নারী’ কে বেছে নিলেন? আমাকে অন্য কোনো অর্ধেক পুরুষের জন্য রেখে দিতে পারতেন। যদিও পুরুষরা অর্ধেক হয় না, তারা শুধুমাত্রই পুরুষ। মাঝে মাঝে মনে হতো, আমার এই ভাঙাচোরা অবস্থাটাই হয়তো তার ভালো লাগত। আমার ভীষণ স্পষ্ট অপূর্ণতাগুলো তার নিজের অপূর্ণতাগুলোকে ঢেকে দিত।
বিয়ের প্রায় আট মাসের মাথায়, হঠাৎ করেই আমি আবার ‘সম্পূর্ণা’ হয়ে উঠলাম। একদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমার ডান চোখটা আবার ফিরে এসেছে। মনে হচ্ছিল যেন নতুন চোখেই আগের চেয়ে বেশি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। শৈশবের সেই টিকটিকির লেজের মতোই, আমার পাটাও দ্রুত গজিয়ে উঠল। দীর্ঘদিন পর আবার দুটি চোখ আর দুটি পা নিয়ে বেঁচে থাকা—এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। এ যেন নতুন জন্ম; আবার একই সঙ্গে ভেতরে কোথাও এক নীরব মৃত্যু।আমার বাবা-মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। এই উপলক্ষে তারা আমার সবচেয়ে মিষ্টি রসগোল্লা আর সন্দেশ নিয়ে এলেন। বাবা গর্ব করে বললেন, ‘বিয়ের বাজারেই ওকে দেখেই বুঝেছিলাম, তোমার জন্য ঠিক মানুষ এ-ই। দেখলে তো! মেয়েটা আমার আবার সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে।‘’ শুরুর দিকে আমার স্বামীও খুশি ছিল, কিন্তু তারপর কিছু একটা বদলে গেল। পুরুষদের গল্পগুলো বোধহয় এমনই হয়। যে হারমোনিয়াম বাজাতে তিনি একসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন (শুধু তার ঘুমের সময় ছাড়া), সেই হারমোনিয়ামই ধীরে ধীরে তার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠল। কখনো তিনি বলতেন, ‘’শব্দ করোনা, খাতা দেখছি।‘’ কখনো বা, ‘’চুপ করো তো।‘’বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে আমার প্রতি তিনি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। পরিবর্তন টা লক্ষ্যনীয় ছিল। তিনি ক্রমশই খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠলেন। বিশ্ববিদ্যালয়েই বেশি সময় থাকতেন। বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত বাহিরে থাকতে লাগলেন। আমার মনে খানিকটা সন্দেহ জাগলেও, ইর্ষা কখনোই ছিল না। কেননা, নিজের শরীরের ‘মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক থেকে বাঁচতে, আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম এবং মানুষটি আমার কাছে একজন আগন্তুক হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। সে কখনোই আমার ছিল না আর আমিও তার কাছে ছিলাম কেবল একটি প্রয়োজন। এই মানুষটির এমন একটি গোপন কুঠুরি ছিল যার নাগাল আমি কখনোই পাই নি।এক রাতে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার জীবনে আর কেউ আছে কি না। বললাম, আমি রাগ করব না—শুধু জানতে চাই।
“না,” সে বলল।
তার কণ্ঠে একটা দ্বিধা ছিল। বুঝতে পারলাম আমি অকারণ সন্দেহ করছি না।
সে বলল, “তুমি অযথাই সন্দেহ করছ।”
“তাই?”
“হ্যাঁ। তোমরা মেয়েরা বরাবরই বেশি ভাবো। এখন ঘুমাও।”
সেই রাতে আমার বিয়েটাকে আমার একটা ডিমের মতো মনে হলো। শুরুতে নিখুঁত, মসৃণ, অক্ষত একটা ডিম। তারপর সেই ডিমে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করল। ফাটলগুলো কোথা থেকে এল, আমি জানি না। শুধু মনে হলো—তার গোপন জীবন, তার প্রতি আমার জমে থাকা ক্ষোভ, আমাদের সার্বিক নিরানন্দ—সবকিছু মিলে ভেতরের কুসুমটা ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। একটা অক্ষত ডিম থেকে ধীরে ধীরে আমরা হয়ে উঠলাম একটা পচা ডিম।
শেষের দিকে মা প্রায়ই আসতেন। তিনি বোধ হয় বুঝতে পারতেন যে আমি ভেতরে ভেতরে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। একদিন মা এলেন। আমি তার কোলে মাথা রাখলাম। মা আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, আর আমার প্রিয় একটা গান গুনগুন করছিলেন।
আমি বললাম,“মা, আমি ওকে ছেড়ে চলে যাব।”
মায়ের হাত হঠাৎ থেমে গেল। “ছেড়ে যাবি?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায় যাবি?”
“তোমাদের কাছেই ফিরে আসব,” আমি বললাম। “তোমরা কি আমাকে নেবে না, মা?”
মায়ের গলা কেঁপে উঠল। “তুই মরে যাবি… আবার পচন ধরবে।”
“ও আমি মেনে নেব, মা।” মুখটা গরম হয়ে উঠছিল, কান্নায় চোখ ভরে উঠছিল।
মানুষ কী বলবে?”—মা প্রায় কেঁদে উঠলেন। “এই বয়সে এসে যদি তুই আলাদা হয়ে যাস… না, তা হয় না।” হঠাৎ করে মা কঠোর হয়ে উঠলেন ঠিক তেমনভাবে যেমনটা ছোটবেলায় আমি পড়তে না বসলে হতেন।
“বিয়ে জিনিসটা এমনই,” মা বললেন। “তোর কাছে নতুন তো, তাই বুঝিস না—”
“আমার আর জানার দরকার নেই,” আমি তাকে থামিয়ে দিলাম।
“তুই নিজের মতো করে বাঁচতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিস। তোর জীবন তো ছিল পাখির মতো, সারাক্ষণ বাইরে বাইরে, কাদের সঙ্গে ঘুরতি, কে জানে! তোর বাবা আর আমি তোকে অনেকটাই ছাড় দিয়েছি। কনসার্টে গিয়েছিস, রেডিও-টেলিভিশনে হারমোনিয়াম বাজিয়েছিস।‘’
সেগুলোতেই আমি সুখী ছিলাম, মা’’, কান্না জড়ানো কন্ঠে বললাম আমি। “আমি তখন সত্যিই খুব সুখী ছিলাম।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর ধীরে বললেন, “তোর বাবার সাথে যখন আমার বিয়ে হয়, আমি টানা একমাস প্রতি রাতে কেঁদেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে সব মেনে নিয়েছি। সময় গেলে তুইও মানিয়ে নিবি।”
আমার বাবা-মাকে আমি সবসময়ই সুখী দম্পতি বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন হঠাৎ মনে হলো মা আমাকে অনেক কিছুই বলেননি। আমি চিৎকার করে উঠলাম, “আমি তোমার মত মানিয়ে নিতে চাই না! বিয়ের আগে আমার জীবনটা তো সুন্দর ছিল! তার জন্য কিছুই তো বদলানোর দরকার ছিল না!”
‘তুই তো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছিলি। তুই অসম্পূর্ণ নারী হয়ে যাচ্ছিলি!”
আমার চোখের পানি মায়ের শাড়িতে গড়িয়ে পড়ছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, “এর থেকে মৃত্যুও ভালো।‘’
মা চুপ করে রইলেন। তিনি আর গুনগুন করে গান করলেন না। শুধু আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। যেটা খুব স্বস্তি দিচ্ছিল আমাকে। শুধু মাঝে মাঝে তার আঙুল আমার চুলের জটের মধ্যে আটকে যাচ্ছিল। আসলে, আমাকে শেষ পর্যন্ত স্বামীকে ছেড়ে যেতে হলো না। মায়ের সাথে সেদিনের আলাপের পর কয়েক মাস কেটে গেছে। এক সন্ধ্যায় আমি রান্না করছিলাম। ঠিক তখনি আমার স্বামী এক তরুণী মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটার বয়স বড়জোর পঁচিশ হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এ কে?” তারপর স্বাভাবিকভাবেই বললাম, “হ্যালো।”
আমি আবার বিয়ে করেছি,” আমার স্বামী বলল। “আজই বিয়ের বাজার থেকে ওকে বেছে এনেছি।”
“কি?”
তখন আমার ভেতরে এক অন্যরকম অনুভূতি হলো। আমি আমার স্বামীকে দেখলাম, তারপর তার নতুন স্ত্রীকে, তারপর আবার স্বামীকে—এবং হঠাৎ মনে হলো আমি যেন নিজের শরীর থেকে বেরিয়ে নতুন এই মেয়েটার শরীরে ঢুকে ওর চোখ দিয়ে এই দৃশ্যটা দেখছি। সে আমাকে দেখে কী ভাবছিল?—রাতের মলিন পোশাকে, ডালের খুন্তি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী। আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—সে এই মানুষটার মধ্যে কী দেখল? এই সেই মানুষ, যে আমাকে অসংখ্যভাবে হতাশ করেছে, এবং খুব শিগগিরই তাকেও একইভাবে হতাশ করবে। তার চোখে আমি নিশ্চয়ই ছিলাম একজন রাগান্বিত, পরিত্যক্ত প্রথম স্ত্রী যে তার স্বপ্নের নিখুঁত দাম্পত্য জীবনের পথে একমাত্র বাধা। দৃশ্যটা যতটাই করুণ ততটাই হাস্যকর।
আমি ডিভোর্স পেপার এনেছি—”
“ঠিক আছে,” আমি শান্ত স্বরে বললাম।
সে যেন একটু থমকে গেল। “ঠিক আছে?”
সে বোধ হয় আশা করেছিল আমি কাঁদব, অনুরোধ করব, তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করব। কিন্তু অসহায় স্ত্রী হওয়ার কোনো চেষ্টাই আমি করি নি। সত্যি বলতে, এমন একজন মানুষ যে আমাকে কখনোই জীবনসঙ্গী হিসেবে দেখেনি, শুধু নিজের একাকীত্ব ঢাকার জন্য আমাকে ব্যবহার করেছে—সেই মানুষের সাথে একই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত থাকার ইচ্ছেও আমার ছিল না।
সস্পূর্ণা হই কিংবা অসম্পূর্ণা— সেদিনই আমি ঠিক করলাম, সামনে যা-ই আসুক, আমি তা মেনে নেব। হয়তো ধীরে ধীরে শরীর ক্ষয়ে যাবে, অঙ্গ ঝরে পড়বে—অথবা খুব দ্রুত, নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। আমি টেবিলে বসে ডিভোর্স পেপারে সই করলাম। ভালো লাগল যে এখনো আমার দুই হাত ঠিক আছে। সেই মুহূর্তে আমি তেমন কিছু অনুভব করিনি। তবে বেশ হালকা লেগেছিল যেন অনেকদিন পর বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেছে। আমার (সাবেক) স্বামী যখন তার নতুন, তরুণী স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল, আমি রাগও করলাম না, দুঃখও পেলাম না। শুধু ভাবলাম আমার সামনের দিনগুলো এখন কেমন হবে। আমি বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে বলল, “তুমি মারা যাবে’। “আমাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না।”
সেই রাতেই বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এলাম। সে রাতের পরিবেশটা ছিল ভারী—একদিকে আনন্দ, অন্য দিকে শোক। আমরা কেউ জানতাম না আমার হাতে আর কতটা সময় আছে, বা এরপর আমার শরীর থেকে আর কী ঝরে পড়বে। এই “ম্লান হয়ে যাওয়া” রোগটা কীভাবে কাজ করে, বিজ্ঞানে সে বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না। কিন্তু এ রোগ সারানোর উপায় হিসেবে মেয়েরা বিয়ে করাকেই বেছে নিত। আমি তো সেটা করেছিলাম।সে রাতে গভীর রাত পর্যন্ত আমি হারমোনিয়াম বাজালাম । ঘর ভরে গেল আমার সা-রে-গা-মা-র শব্দে। মা আমার পাশে ঘুমালেন, ঠিক যেমনটা আমার চোখ হারানোর রাতে ঘুমিয়েছিলেন। আর ছোটবেলাতেও প্রায়ই এমন করতেন। ঘুমের আগ মুহূর্তে মা ফিসফিস করে বললেন, “মাফ কর, মা। তোকে বাঁচানোর অন্য উপায় খুঁজে দেখা উচিত ছিল।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, মা। তুমি যা করতে পেরেছ, তাই করেছ। এর চেয়ে বেশি তো তুমি জানতে না।” পরদিন সকালে, এবং তারপর আমার বাকি জীবনে আমি দুই পায়ে ভর করেই দাঁড়িয়েছি এবং পৃথিবীকে দেখেছি নতুন চোখে।

মন্তব্যসমূহ