পহেলা বৈশাখে ‘মঙ্গল’ নাম দিয়েই শোভাযাত্রা করবে ‘বর্ষবরণ পর্ষদ’
![]() |
| রাজধানীর ধানমণ্ডির তক্ষশিলা বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রোববার চলছে বর্ষবরণ পর্ষদের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের প্রস্তুতি। |
পহেলা বৈশাখে ‘ঐতিহ্য’ ধরে রাখতে ‘মঙ্গল’ নাম দিয়েই শোভযাত্রা করার কথা বলেছেন একদল সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মী।
‘বর্ষবরণ পর্ষদ’ এর ব্যানারে ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ স্লোগানে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন মঙ্গলবার সকালে এই শোভাযাত্রা রাজধানীর ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর থেকে বের হবে।
এ আয়োজনের উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবন্ধতার শিকার হয়েছি। নাম বদলে দিলেও আমাদের এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতিকে আমরা রক্ষা করবো অবশ্যই।”
আশির দশকে পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে যে শোভাযাত্রা বের হত, পরে তা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায়’ রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার’ বিরোধিতা শুরু করে। ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
এবার এ শোভাযাত্রার নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নববর্ষ বরণে ওইদিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এ শোভাযাত্রা হবে।
নাম পরিবর্তনের বিষয়ে গেল ৫ এপ্রিল সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। পহেলা বৈশাখ মূলত সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও কৃষকের উৎসব।
“আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক সরকার। গণতন্ত্রে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য থাকবে। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।”
ধানমন্ডিতে মঙ্গল শোভাযাত্রা, যত আয়োজন
রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডিতে তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চলছে বর্ষবরণ পর্ষদের ‘মঙ্গল শোভাযত্রার’ প্রস্তুতি।
রোববার দুপুরে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে, কাগজ দিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোড়ার অবয়ব; গায়ে তখনো রঙের ছোঁয়া লাগেনি। তবে কাঠ ও কাগজ দিয়ে তৈরি পাখি, পেঁচা, পায়রা ও হাতি সেজেছে নানা রঙে। এছাড়া তবলা, দোতরার আদলের সঙ্গে রয়েছে বাঘ, প্যাঁচাসহ নানা কল্পিত চরিত্রের মুখোশ।
আয়োজকরা বলছেন, অন্তবর্তী সরকারের সময় থেকে পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রার ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়ায় তারা মনক্ষুন্ন। তাই জাতীয়ভাবে উদযাপন করা শোভাযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন না তারা।
তক্ষশিলার ক্যাম্পাসেই কথা হয় বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলামের সঙ্গে। মঙ্গল নাম নিয়ে আলাদা শোভাযাত্রা আয়োজনের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। এটা আমরা চারুকলা থেকে করি। এই শোভাযাত্রার সঙ্গে অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু আমাদের এই মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে নানা রকম অপচেষ্টা...এবং কুচক্রীমহল-আমি কুচক্রীমহলই বলি-যেটা আন্তজার্তিকভবে স্বীকৃত একটা উৎসব; আমাদের নিজেদের উৎসব, পহেলা উৎসব বাঙালির উৎসব। ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবন্ধতার শিকার হয়েছি। নাম বদলে দিল। আমাদের এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতিকে আমরা রক্ষা করব অবশ্যই।”
আয়োজক পর্ষদের সঙ্গে যুক্তদের নাম বলতে অনিচ্ছুক হলেও শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার স্থান বিষয়ে তিনি বলেন, “পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। এখানে যুক্ত অধিকাংশই নব্বইয়ের দশকের মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মানুষ এখানে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তাদের উদ্যোগেই এই আয়োজন করা হয়েছে।
ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের মিনা বাজারের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা আরম্ভ হবে। তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের সব শিশু ও অভিভাবক এতে অংশ নেবেন।”
দেশের প্রগতিশীল চিন্তার মানুষরা এখানে অংশগ্রহণ করবেন-এমন প্রত্যাশা এ শিক্ষকের।
জানা যায়, এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একদল শিক্ষার্থী। মোটিফ ও মুখোশ তৈরির কাজ করছেন তারা।
আয়োজনে যুক্ত চারুকলা অনুষদের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, “এখনো আমি প্রথম বর্ষে... তাই নাম প্রকাশ করতে শঙ্কিত। তবে স্কুলজীবন থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম শুনে এসেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেখি ‘বৈশাখী’ শোভাযাত্রা। মন একটু খারাপ ছিল। পরে জানতে পেরেছি এখানে ‘মঙ্গল’ নাম দিয়ে শোভাযাত্রা হবে। তাই কাজে যুক্ত হয়েছি।”
নাদিমুল ইসলাম বলেন, “এখনো শেষ হয়নি সম্পূর্ণ আয়োজন। অনুষঙ্গগুলোতে রাতেই দেওয়া হবে তুলির শেষ আঁচড়। আজ রাতেই শেষ হবে।”
এদিকে আরো কয়েকটি সংগঠনও আলাদা করে পহেলা বৈশাখে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছে, চারণ সংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রণ্ট, সাম্যবাদী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল সংগঠন।
চারণ ও ছাত্রফ্রন্টের যৌথ আয়োজনে এই শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য- ‘নতুন বছরের সূর্যে জাগুক মুক্তির গান, যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রাণ’। পহেলা বৈশাখের দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপ থেকে তারা এই শোভাযাত্রা শুরু করবে।


মন্তব্যসমূহ