জাইমা কি রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু, না অসুস্থ মানসিকতার শিকার?
![]() |
জাইমা রহমানকে নিয়ে তৈরি কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড কি কেবল রাজনৈতিক অসূয়াপ্রসূত, নাকি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত নারীবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ?
নারী? তাকে মানুষ হিসেবে ভাবার কী আছে! সে তো ভোগের সামগ্রী—তাকে নিয়ে যত খুশি তামাশা করো, টেনে নামাও, ছিঁড়ে খুঁড়ে দেখো—তাতে কেউ বাধা দেবে না; বরং হাততালি দেবে।’
এই নিষ্ঠুর, লজ্জাজনক বাক্যটি কেউ প্রকাশ্যে বলে না—কিন্তু আমাদের সামাজিক আচরণ, বিশেষ করে অনলাইন জগতে, প্রতিদিন যেন এই কথাটিই প্রমাণ করে যাচ্ছে। ফেইসবুকে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ে কোনো নারীর ছবি—সঙ্গে অশ্লীল মন্তব্যের বন্যা। কেউ তার পোশাক বিশ্লেষণ করছে, কেউ শরীর, কেউ চরিত্র; যেন একজন মানুষ নয়, একটি ‘ভোগ্য বস্তু’কে ঘিরে চলছে আদিম উল্লাস
।এই উল্লাসের সাম্প্রতিক উদাহরণ—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড। কে বানিয়েছে, কে ছড়িয়েছে—সেটি খুঁজে বের করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—এমন কিছু তৈরি করার সাহস মানুষ পায় কীভাবে? আর কেনই বা এত মানুষ সেটি দেখার, শেয়ার করার, উপভোগ করার মানসিকতা রাখে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে—সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়, এটি একটি মানসিকতা, সংস্কৃতি। এমন একটি অসুস্থ সংস্কৃতি, যেখানে নারীকে অবমাননা করা বিনোদন, তাকে যৌন ইঙ্গিতে নামিয়ে আনা একধরনের ‘স্বাভাবিক’ আচরণ, আর তাকে হেয় করা যেন সামাজিকভাবে অনুমোদিত এক খেলা। মর্যাদা বা সম্মান নয়, মানুষ হিসেবে দেখা নয়, নারীকে দেখা হয় কেবল ‘ভোগের সামগ্রী’ হিসেবে। কী আশ্চর্য এই মানসিকতা!
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার একদিকে মতপ্রকাশের সুযোগকে গণতান্ত্রিক করেছে, অন্যদিকে উন্মোচন করেছে সমাজের এক অন্ধকার মানসিকতা—বিশেষত নারীদের প্রতি। জাইমা রহমানকে নিয়ে যে কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ফটোকার্ড ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক অসুস্থ সামাজিক প্রবণতার নগ্ন প্রকাশ।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—এই সমাজে নারীর পরিচয়, অবস্থান বা অর্জন যাই হোক না কেন, তাকে অবমাননা করার জন্য একটি প্রস্তুত, সংগঠিত ও নিষ্ঠুর সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গেছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা, একজন সেলিব্রেটি, একজন নারী সাংবাদিক, একজন লেখক, একজন ক্রীড়াবিদ কিংবা একজন সাধারণ শ্রমজীবী নারী—কেউই এই আক্রমণ থেকে মুক্ত নন। বরং ক্ষমতা, দৃশ্যমানতা বা জনপ্রিয়তা যত বেশি, আক্রমণের তীব্রতাও তত বেশি।
এই ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রতিবাদী হয়েছে, এটা ভালো লক্ষণ; তবে তাদের মনে রাখা উচিত যে, কেবল জাইমা নয়, যেকোনো নারী অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। নারী অবমাননা ও নির্যাতনের জাত, বর্ণ, দল নেই। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর মেয়ে নির্যাতিত হোক কিংবা বিএনপির নেত্রী, অথবা অন্য কেউ—সবই সমান আপত্তিকর ও সমান ভয়াবহ। নারীর যৌন নিগ্রহ কোনো দলীয় ইস্যু নয়; এটি একটি সামাজিক অসুস্থতা।
জাইমা রহমানকে ঘিরে এই সাম্প্রতিক কদর্যতা এই অসুস্থতারই বহির্প্রকাশ। এর আগেও তাকে নিয়ে একই ধরনের নোংরা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি জাইমা নামের একটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়; এটি আসলে নারীকে কীভাবে দেখা হয়, সেই গভীর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এখানে নারীকে ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় না; তাকে দেখা হয় একটি ‘বস্তু’ হিসেবে, একটি ‘টার্গেট’ হিসেবে, যার প্রতি যৌন ইঙ্গিত, অবমাননাকর ভাষা বা চরিত্রহননমূলক মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া যেন এক ধরনের বিনোদন।
এই সংস্কৃতির শিকড় বহু গভীরে। আমাদের সামাজিক কাঠামো এখনো পুরুষতান্ত্রিক, যেখানে নারীর স্বাধীনতা, সাফল্য বা দৃশ্যমানতা অনেক সময় হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ফলে সেই ‘হুমকি’কে নিয়ন্ত্রণ বা ছোট করার সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায় তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তার শরীর নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা, বা তাকে যৌনভাবে হেয় করা। এটি এক ধরনের ‘সামাজিক শাস্তি’, যা নারীকে বার্তা দেয়—তুমি যতই এগোও, তোমাকে আমরা নিচে নামাতে পারি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যে ধরনের মন্তব্য বন্ধ ঘরের আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা প্রকাশ্যে, অগণিত মানুষের সামনে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে ভুয়া আইডি, নাম-পরিচয়হীনতা এবং দায়হীনতা—সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘ইমিউনিটি’ তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের সবচেয়ে নীচ, অশ্লীল এবং সহিংস মানসিকতাকে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ট্রোলিং কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের কৌশল নয়; এটি মূলত নারী বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক বিতর্কে মতাদর্শগত বিরোধ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই বিরোধ যখন নারীর শরীর, ব্যক্তিগত জীবন বা মর্যাদাকে আঘাত করে, তখন তা আর রাজনীতি থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিছক সহিংসতা। নারী সাংবাদিকদের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তারা যখন কোনো কঠিন প্রশ্ন করেন বা ক্ষমতার সমালোচনা করেন, তখন তাদের পেশাগত অবস্থান নয়, বরং তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, এমনকি শরীর নিয়ে মন্তব্য করা হয়। নারী লেখকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—তাদের লেখা নিয়ে বিতর্ক না করে তাদের চরিত্র নিয়ে আক্রমণ করা হয়। নারী ক্রীড়াবিদরা যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য আনেন, তখনও তাদের কৃতিত্বের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা চেহারা।
এই প্রবণতা শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাস্তব জীবনের প্রতিফলন। পারিবারিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত পরিবেশে যে নারীবিদ্বেষী মনোভাব তৈরি হয়, সেটিই অনলাইনে আরও উগ্র রূপ নেয়। ফলে সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি গভীরভাবে সাংস্কৃতিক।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার অপরাধ দমন করা, দোষীদের শনাক্ত করা এবং শাস্তির আওতায় আনা—এসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কেবল আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন, যেখানে নারীর প্রতি সম্মান, সমতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীকে নিয়ে নোংরামি মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পেশাজীবী সব নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার ও আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ও যেখানে নারীরা ট্রোলের শিকার হচ্ছেন, সেখানে রাষ্ট্রের উচিত শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। যতদিন পর্যন্ত নারীর ছবি ঘিরে সহজে অশ্লীল কথা লেখা, এডিট করা আর সেটা ভাইরাল করা সম্ভব হবে, ততদিন আমরা প্রকৃত মুক্তি পাব না। এ জন্য ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, একটি কুরুচিপূর্ণ পোস্ট শেয়ার করার মাধ্যমেও তারা অপরাধে অংশ নিচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করা, পরিবারে ছেলেমেয়েদের সমানভাবে বড় করা, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল উপস্থাপন—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে এই মানসিকতা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকেও আরও কঠোর হতে হবে—অশ্লীলতা ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যখন কেউ কোনো নারীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে, তখন সেটিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ হিসেবে না নিয়ে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। নীরবতা এখানে সহমতের সমান।
জাইমা রহমানের ঘটনাটি তাই একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতার কেন্দ্রেও থাকা একজন নারীও এই আক্রমণ থেকে রেহাই পান না। তাহলে সাধারণ নারীদের অবস্থান কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি আলোর দিক আছে—একজন তরুণী, একজন নারী, কীভাবে প্রতিনিয়ত কটাক্ষ, নোংরামি, নোংরা ফটোকার্ড, ছদ্মবেশী পরিচয়ে আক্রমণাত্মক বার্তার মোকাবিলা করেন, ক্ষত নিয়ে কীভাবে হাঁটেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে দাঁড়ান, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এসবের পরও কীভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকেন, সেটাও দেখিয়ে দেয়। নারীরা প্রতিদিন এই আক্রমণের মধ্য দিয়েও দাঁড়িয়ে থাকছেন, কাজ করছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন। তারা ভেঙে পড়ছেন না; বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। জাইমা রহমানও নিশ্চয়ই সেই শক্তির অংশ হবেন—এটাই প্রত্যাশা।
শেষ পর্যন্ত, এই লড়াই কেবল নারীদের নয়; এটি একটি সমাজের মানবিকতা রক্ষার লড়াই। আমরা কী ধরনের সমাজ গড়তে চাই—যেখানে নারীর মর্যাদা সুরক্ষিত, নাকি তেমন সমাজ যেখানে অশ্লীলতা ও বিদ্বেষই নিয়ম? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।

মন্তব্যসমূহ