কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরলেন লিমন

 

লিমনের বাবা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বিদেশে পড়তে গিয়ে আর যেন কেউ এভাবে প্রাণ না হারায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ ঢাকা দেশে এসে পৌঁছেছে।


সোমবার সকাল ৮ টা ৫৯ মিনিটে লিমনের মরদেহ বহনকারী এমিরেটসের ফ্লাইটটি (ইকে ৫৮২) ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।

এর আগে শনিবার রাত ৯.৫০ মিনিটে ফ্লোরিডার অরল‍্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমিরাটসের একটি ফ্লাইটে লিমনের কফিন তুলে দেওয়া হয় বলে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছিল।


লিমনের মরদেহ বুঝে নিতে সকালেই বিমানবন্দরের কার্গো গেটে এসে হাজির হন তার পরিবারের সদস্যরা।



সেখানে উপস্থিত লিমনের মামা মর্তুজা শেখ জসিম সাংবাদিকদের বলেন, মরদেহ নিয়ে তারা জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে যাবেন। মাগরিবের নামাজের পর লিমনের জানাজা ও দাফন হওয়ার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা মার্কিন সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার আশা করি।”


যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ছেলের লাশ নিতে আসা লিমনের বাবা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বিদেশে পড়তে গিয়ে আর যেন কেউ এভাবে প্রাণ না হারায়।


তিনি বলেন, "পহেলা বৈশাখের দিন আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বলেছিল সে খুবই ব্যস্ত। কোনো ধরনের সমস্যা বা অসঙ্গতির বিষয়ে সে পরিবারকে কিছু জানায়নি।


"শুধু তার মাকে বলেছিল, ওই ছেলেটা সব সময় ঘরের ভেতর থাকে, অ্যাবনরমালের মত কেমন কেমন করে। ওর মা বলেছিল, থাক বাবা ও ওর মত থাক, তুমি তোমার মত ভালো থাকার চেষ্টা করো।"

লিমনের বাবা বলেন, "আমার সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে আমি নিজে অনেক কষ্ট করে ছেলে দুটোকে বড় করেছি। কোনদিন তাদের শারীরিক আঘাত করিনি। যা শাসন করেছি মুখে শাসন করেছি। আমার ছেলেকে এইভাবে মরতে হবে... উপরওয়ালা জানেন ছেলেটাকে কি কষ্ট দিয়ে মারছে।"


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।


ওই সময় থেকেই নিখোঁজ হন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন।

তাদের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবার। পরে গত ২৪ এপ্রিল স্থানীয় একটি সেতুর কাছ থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে।


লিমনের লাশ উদ্ধারের পর ওইদিনই তার রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়।



এদিকে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চলাকালে স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। পরীক্ষার পর শুক্রবার পরিবারকে জানানো হয়, ওই দেহাবশেষ বৃষ্টির।

লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বাংলাদেশ থেকে ফ্লোরিডার একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, লিমন ও বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক সাড়ে চার বছরের। তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।


পরিবারের পক্ষ থেকেও দ্বিমত ছিল না। তবে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেই তারা বিয়ের কাজটি সারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা।


বৃষ্টির মরদেহ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে


এ সময় বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালের বাইরে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, লিমনের মা-বাবা ভাই, পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নাই।



“তবে ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তার বাবার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছি। এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে আমাদের যে মিশন আছে তারা সার্বক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ রেখেছে।”

নিহত বৃষ্টির প্রসঙ্গে তিনি শামা ওবায়েদ বলেন, “লিমনের সাথে আরো একটি মেয়ে আমাদের বাংলাদেশের সন্তান বৃষ্টিও নিহত হয়েছে। বৃষ্টির মরদেহ সম্প্রতি শনাক্ত করা গেছে। তার মরদেহ দ্রুত ফেরত আনার কাজ চলছে।


“আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি এখানে এসেছি লিমনের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। তবে বাবা মায়ের সামনে যখন সন্তানের মৃত্যু হয় তখন সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা থাকে না।”


এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং এর জন্য যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।”

লিমনে বাবার সঙ্গে এ সময় কথা বলেন শামা ওবায়েদ। তার পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে লিমনের বাবা ইলিয়াস হোসেন বলেন, "আগে আমি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতাম। পরে আমার ছেলে আমাকে চাকরি করতে দেয়নি। আমাকে বলছিল তোমার চাকরি করা লাগবে না, তোমার কিচ্ছু করা লাগবে না, তুমি কোন চিন্তা করো না। আমার বড় ছেলে আমাদের সবাইকে আগলে রেখেছিল।"


এরপর লিমনের মরদেহ নিয়ে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হয় তার পরিবার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বরিশালে ‘হানিট্র্যাপ চক্রের’ তরুণীসহ গ্রেপ্তার ২

ডাকসু নির্বাচন: কে হবেন ভিপি, কে হবেন জিএস? জানা গেলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম

Govt withdraws fuel rationing