১৯৭৮ বিশ্বকাপ: ফাইনালে ফের ডাচদের হার, আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপা
৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান আর্জেন্টিনার, প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি ফাইনালে হারে নেদারল্যান্ডস।
আর্জেন্টিনায় ১৯৭৮ সালের ১ থেকে ২৫ জুন বসে বিশ্বকাপের একাদশ আসর। ১০৭ দলের বাছাই পর্ব পেরিয়ে জায়গা করে নেয় ১৪ দল।
১৬ দল নিয়ে এটাই বিশ্বকাপের শেষ আসর।
নেদারল্যান্ডসের আরেকটি হৃদয় ভাঙা গল্পের মাঝে চার যুগের অপেক্ষার অবসান হয় আর্জেন্টিনার। প্রথম আসরের ফাইনালিস্টরা শিরোপার অনির্বচনীয় স্বাদ পায় ১৯৭৮ সালে, ঘরের মাঠে। প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি ফাইনালে হারে নেদারল্যান্ডস।
সেই ১৯৬২ সালে ৮ অগাস্ট টোকিওতে ফিফা কংগ্রেসে নবম আসরের সঙ্গে একাদশ আসরের স্বাগতিকদের নাম ঘোষণা করা হয়।
এই আসর নিয়ে বিতর্কের কমতি নেই। অভিযোগ আছে আর্জেন্টিনার সে সময়ের স্বৈরশাসক হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা স্বাগতিকদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন। ম্যাচ পাতানোর বিতর্কও আছে।
বাছাই পর্বে খেললেও মূল পর্বে খেলেননি ডাচ অধিনায়ক ই্য়োহান ক্রুইফ। বিশ্বকাপে প্রথম প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরি কোচের ভাষ্য ছিল, বিশ্বকাপের বাতাসও নাকি আর্জেন্টিনার পক্ষে!
এই আসর দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হতে পারত দিয়েগো মারাদোনার। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে বিশ্ব মঞ্চের চাপ তিনি সামলাতে পারবেন কি না, এ্ই সংশয়ে তখন তাকে দলে নেননি সেজার লুইস মেনেত্তি। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন দেশটির ফুটবল ভক্তরা।
১৬ দলের টুর্নামেন্টে সরাসরি খেলে স্বাগতিক আর্জেন্টিনা ও গত আসরের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে দেশগুলো-
ইউরোপ; পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, সুইডেন ও স্পেন
দক্ষিণ আমেরিকা: আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও পেরু।
উত্তর আমেরিকা: মেক্সিকো
এশিয়া: ইরান
আফ্রিকা: তিউনিসিয়া
ইরান ও তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপে অভিষেক হয় এই আসর দিয়ে।
১৬ দল চারটি গ্রুপে খেলে, গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ১: আর্জেন্টিনা, ইতালি, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি
গ্রুপ ২: পশ্চিম জার্মানি, পোল্যান্ড, তিউনিসিয়া, মেক্সিকো
গ্রুপ ৩: অস্ট্রিয়া, ব্রাজিল, স্পেন, সুইডেন
গ্রুপ ৪: নেদারল্যান্ডস, পেরু, স্কটল্যান্ড, ইরান
প্রথম রাউন্ড
আগের আসরের ফরম্যাটেই খেলা হয় আর্জেন্টিনায়। প্রথম রাউন্ডে ১৬ দেশকে চারটি গ্রুপে খেলানো হয়। সেরা দুটি করে দল যায় পরের ধাপে। সেখানে আট দলকে খেলানো হয় দুটি নতুন গ্রুপে। সেই রাউন্ডের সেরা দুই দল খেলে ফাইনালে, দুই গ্রুপ রানার্সআপ মুখোমুখি হয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
এই ফরম্যাট কেবল দশম ও একাদশ বিশ্বকাপেই ব্যবহৃত হয়।
গ্রুপ ১ থেকে পরের ধাপে যায় ইতালি ও আর্জেন্টিনা। তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ইতালি। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তাদের সঙ্গী হয় আর্জেন্টিনা। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় ফ্রান্স। সব ম্যাচ হেরে শূন্য হাতে ফেরে হাঙ্গেরি।
গ্রুপ ২ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় পোল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পোল্যান্ড। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ পশ্চিম জার্মানি।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় তিউনিসিয়া। তিন হারে শূন্য হাতে বিদায় নেয় মেক্সিকো।
গ্রুপ ৩ থেকে পরের ধাপে যায় অস্ট্রিয়া ও ব্রাজিল। দুই জয়ে অস্ট্রিয়া পায় ৪ পয়েন্ট। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ব্রাজিলেরও পয়েন্ট হয় চার। দুই দলের গোল পার্থক্যও ছিল সমান +১। গোল বেশি করায় শীর্ষ স্থান পায় অস্ট্রিয়া।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তিনে থেকে আসর শেষ করে স্পেন। সুইডেনের প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ৪ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় পেরু ও নেদারল্যান্ডস। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পেরু। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট পায় নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ড। গোল পার্থক্য এগিয়ে থাকায় টিকে যায় নেদারল্যান্ডস। অভিষেক আসরে ইরানের প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
এই আসরের দুটি হ্যাট্রিকই হয় ইরানের বিপক্ষে। ৩ জুনের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের জয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন রব রেন্সেনব্রিঙ্ক। ১১ জুন পেরুর ৪-১ ব্যবধানের জয়ে হ্যাটট্রিক করেন পেরুর তেফিলো কুবিয়াস।
দ্বিতীয় রাউন্ড
গ্রুপ এ: নেদারল্যান্ডস, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, অষ্ট্রিয়া
গ্রুপ বি: আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পেরু, পোল্যান্ড
গ্রুপ ‘এ’ থেকে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ফাইনালে যায় নেদারল্যান্ডস। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলার সুযোগ পায় ইতালি। দুই ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় পশ্চিম জার্মানি। এক জয়ে ২ পয়েন্ট পায় অস্ট্রিয়া।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে ফাইনালে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ ম্যাচে পেরুকে গোল বন্যায় ভাসিয়ে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে তারা। গোল পার্থক্য স্বাগতিকরা জায়গা করে নেয় ফাইনালে মঞ্চে।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ হয় গোলশূন্য ড্র। প্রথম দুই রাউন্ড শেষে +২ গোলে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সম্ভাবনা আরও বাড়ায় তারা। কিন্তু তাদের হতাশায় ডুবিয়ে, পাতানো ম্যাচের প্রশ্নকে উচ্চকিত করে পেরুকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা!
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইতালিকে ২-১ গোলে হারায় ব্রাজিল।
ফাইনাল
২৫ জুন, ১৯৭৮। প্রায় ৭২ হাজার দর্শকের উপস্থতিতে এল মনুমেন্তালে প্রথম শিরোপার লড়াইয়ে নামে আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডস।
৩৮তম মিনিটে মারিও কেম্পেসের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৮২তম মিনিটে সমতা ফিরিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নেয় নেদারল্যান্ড। সেখানে আর পারেনি তারা। কেম্পেস ও রিকার্দো বের্তোনির গোলে প্রথম শিরোপার উল্লাসে মাতে আর্জেন্টিনা।
এক নজরে একাদশ বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: আর্জেন্টিনা
চ্যাম্পিয়ন: আর্জেন্টিনা
রানার্স আপ: নেদারল্যান্ডস
মোট ম্যাচ: ৩৮
মোট গোল: ১০২
গোল গড়: ২.৬৮
সর্বোচ্চ গোল: মারিও কেম্পেস [৬ গোল- আর্জেন্টিনা]
সেরা খেলোয়াড়: মারিও কেম্পেস (আর্জেন্টিনা) [আন অফিসিয়াল]

মন্তব্যসমূহ