রাজনৈতিক পালাবদল: দুই বছরে তিন আমল
গত দুই বছরেরও কম সময়ে দেশ প্রত্যক্ষ করেছে তিনটি ভিন্ন শাসনপর্ব-আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ অধ্যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারকাল এবং নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সরকারের নতুন যাত্রা।
ইতিহাসের বিচারে এমন দ্রুত রাজনৈতিক রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য বিরল অভিজ্ঞতা।
এই রাজনৈতিক পালাবদলের সূত্রপাত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।
সেই আন্দোলনেরও ছিল এক প্রেক্ষাপট।
সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূনর্বহালের এক রায়কে ঘিরে জুলাইয়ের এক তারিখে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন সাড়ে ১৫ বছরের জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা এক সরকারের পতন ঘটিয়ে দেয়।
তবে এই পরিবর্তন খুব সহজ ছিল না।
ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর ফলে সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনে এসে শরিক হয়। অনেক রক্তক্ষয় আর হতাহতের মধ্যে দিয়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী সরকার ও তার দোসররা।
২০০৯ সালে সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করা আওয়ামী লীগ সরকার একটানা চার বার ক্ষমতা আসলেও শেষটা তার ভালো হলো না। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা বসার সাত মাসের মাথায় ৫ আগস্ট দেশ ছাড়তে হয় তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে।
তিনটা দিন দেশ চলে কোনো সরকার ছাড়াই। ৮ আগস্ট ছাত্রদের আহ্বানে দেশে ফিরে ক্ষমতা মসনদে বসেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছাত্রপ্রতিনিধি ও দেশের প্রবীন এক ঝাঁক অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
রাষ্ট্র মেরামতের’ প্রত্যয় ও জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে সামনে রেখে সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয় সেই সরকারের পথ চলা।
তবে নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিতে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। রাজপথে একের পর এক আন্দোলন, শিল্পখাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্যের ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য নির্বাচনের আলোচনা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। চূড়ান্ত সংস্কারের অভাবে কিছুটা দেরি হলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে নির্বাচনের পথে পা বাড়ায় অন্তবর্তী সরকার।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আর এত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
জুলাই আন্দোলনে সরকার পতন
তবে রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই- আগস্টের আন্দোলনের সেই দৃশ্য এখনও অনেকের স্মৃতিতে অম্লান। রাজধানীর রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢল, দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ এবং পরিবর্তনের দাবিতে উত্তাল জনসমুদ্র যেন এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছিল। বছরের পর বছর ধরে ভোটাধিকার সংকট, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, গুম-খুনের অভিযোগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি,
আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। টানা ৩৬দিনের আন্দোলনে ক্ষমতা ছাড়তে হয় আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়
সরকার পতনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—এরপর কী? রাজনৈতিক শূন্যতা, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগের মধ্যেই দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনামলে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারের প্রচেষ্টা, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার আলোচনা জনপরিসরে গুরুত্ব পায়। যদিও সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল-বাংলাদেশ আবার ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে ফিরছে। দীর্ঘদিন পর সাধারণ মানুষের আলোচনায় ফিরে আসে ভোটের মূল্য এবং জনমতের সরকার।
সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে। ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারি, তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফলের জন্য সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেককে অতীতের প্রাণবন্ত নির্বাচনের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়। নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি কেবল একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
আপোসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার জীবনাবসান
দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পরও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে ফেরা হবে কি না অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা নিয়েও সংসয় দেখা দিচ্ছিল রাজনৈতিক এই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে।
এমন কি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আপোসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ্য হয়ে পড়লেও তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অনেক বছর পর চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান বিএনপির তৎকালিন চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
তবে দেশে ফিরে আসার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে অনেকটা অসুস্থ্য হয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। এখানেই কাটে তার শেষ দিনগুলো।
দেশে ফেরার মাত্র ৫৫ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী
এর মধ্যে সকল বাধা কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তারেক রহমান। তাকে এক নজর দেখতে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে কুড়িল সংলগ্ন তিনশ ফিটের রাস্তা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। সেখানেই তার জন্য তৈরি কর হয় মঞ্চ। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এক নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে দেশবাসীকে তার পরিকল্পনার কথা জানা। তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’ বক্তব্যের শেষে আবার বলেন, ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান, ফর দ্যা পিপুল, ফর দ্যা কান্ট্রি।’
অবশ্য এর কয়েকদিনের মাথায় ৩০ ডিসেম্বর জীবনাবসান ঘটে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার। ৩১ ডিসেম্বর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে পরম যত্নে তাকে দাফন করা হয়।
এর মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলে দ্বাদশ নির্বাচনের প্রস্তুতি। রাজসিক প্রত্যাবর্তনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এখন দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র ৫৫ দিনে বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণ বদলে দেন তিনি।
তিন সরকারের শপথ পড়িয়েছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী এবং তার নতুন মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন মন্ত্রিসভায় সর্বমোট ৪৯ জন সদস্য ছিলেন।
গত দুই বছরে যে সরকারগুলো গঠিত হয়েছে অর্থাৎ তিনটি শাসনপর্বে সবগুলোর প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছেই শপথ গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ মোট ১৪ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। বঙ্গভবনে তাদের সকলকেই শপথবাক্য পাঠ করার রাষ্ট্রপতি।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভারও শপথ পড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে এর মাত্র কয়েক মাস পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। নতুন সরকার কিছু পদক্ষেপ দ্রুত জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের তুলনামূলক সাদামাটা জীবনযাপন, সরকারি ব্যয়ে সংযম, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সময়ানুবর্তিতার ওপর জোর সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি খাতে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে
পররাষ্ট্রনীতিতেও নতুন সরকারের অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশল এবং সীমান্ত ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান জনগণের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
শেষ কথা, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরকার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। কারণ জনগণ আর শুধু নতুন মুখ চায় না; তারা চায় নতুন ধারা। এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ভোট হবে উৎসব, বিরোধিতা হবে অধিকার, রাষ্ট্র হবে সবার এবং ক্ষমতা হবে জনগণের অর্পিত আমানত।


মন্তব্যসমূহ