চীন সফর: বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতাকে কি প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারবে বাংলাদেশ?
![]() |
| চীনের তালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও |
চীনের ঋণ-প্রযুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আর ভারতের জ্বালানি ও ভৌগোলিক ট্রানজিট—এই ত্রিমাত্রিক সমীকরণ থেকে বাংলাদেশ কি পারবে নিজের অর্থনৈতিক সুবিধা বের করে আনতে?
চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান উচ্চপর্যায়ের সফরকে নিছক একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য আড়াল হয়ে যায়। তালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোসে অংশগ্রহণ, বেইজিংয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা এবং একাধিক নতুন সমঝোতা ও চুক্তির আলোচনা এই সফরকে একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কূটনৈতিক বার্তার মঞ্চে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক সংবাদভিত্তিক তথ্য বলছে—এই সফরে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তিস্তা প্রকল্পও এজেন্ডায় এসেছে, আর চীনের সহায়তায় চট্টগ্রামের
আনোয়ারায় ৩৪ কোটি ডলারের একটি অবকাঠামো নির্মাণের কথাও সামনে এসেছে; যা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের কর্মসংস্থান ও বিদেশি বিনিয়োগ টানতে পারবে। একই সঙ্গে এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে চীন সফরটি শুধু পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নয়; টেকসই উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বৃহত্তর কৌশলেরও অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই কূটনৈতিক ভারসাম্যকে আরও অনিবার্য করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যে জিডিপি প্রায় ৫১,০৭১ কোটি মার্কিন ডলার, আর বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশের কাছাকাছি। একই সঙ্গে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি, অর্থাৎ অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, ততই রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রশ্নে বাংলাদেশের ওপর বৈশ্বিক চাপও বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আয় ৪,৮২৮ কোটি ডলার এবং সেবা খাতের রপ্তানি ৬৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রবাসী আয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে; ২০২৫ সালে রেমিটেন্স ৩,২৮০ কোটি ডলারে উঠেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা সামাল দিতে সাহায্য করছে। এই সংখ্যাগুলো বলে দেয়—
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কেবল আদর্শিক পছন্দের বিষয় নয়, সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প উৎপাদন, আমদানি সক্ষমতা এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প। 'অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল'-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক সংবাদ বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৮২০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে এবং মার্কিন অ্যাপারেল বাজারে তার অংশ ১০.৫৩ শতাংশে উঠেছে; যা এক বছর আগের ৯.২৬ শতাংশের তুলনায় বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়ক্ষমতা, শুল্কনীতি, শ্রমমান এবং সাপ্লাই চেইনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের অগাস্টে বাংলাদেশি পোশাকের ওপর মার্কিন শুল্ক ৩৭ শতাংশের প্রস্তাবিত পর্যায় থেকে ২০ শতাংশে নামানো হয়; যা তৈরি পোশাক শিল্পের
জন্য বড় স্বস্তির খবর হলেও একই সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের রপ্তানি ভবিষ্যৎ এখনও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়, লাখো শ্রমিকের জীবিকারও প্রশ্ন।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি ভিন্ন, কিন্তু সমানভাবে গভীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অক্টোবর ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পণ্য বাণিজ্যে চীনের অংশ ছিল ২০.৫০ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ২৮,২০২.৪ কোটি টাকা; একই মাসে ভারতের অংশ ৯.০৮ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৮.১৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি মাসের ছবি হলেও এটি বাস্তব প্রবণতা স্পষ্ট করে: চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, বিশেষত আমদানির ক্ষেত্রে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে—চীন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১,৮০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনা পণ্যের আমদানির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, যন্ত্রপাতি আমদানি, কাঁচামাল, অবকাঠামো নির্মাণ, বন্দর, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে চীনের উপস্থিতি তাই কেবল ব্যবসার নয়, কৌশলগত
নির্ভরতারও প্রতিফলন। সাম্প্রতিক চীন সফরে চীনা ঋণের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা, শিল্পকারখানা স্থানান্তর, পানি ব্যবস্থাপনা, পারস্পরিক বিনিয়োগ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার খবরও এসেছে। অর্থাৎ বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের কাছে শুধু অর্থায়নের সুযোগ নয়, রীতিমতন উৎপাদনভিত্তি বদলে ফেলারও একটি সম্ভাব্য পথ।
তবে চীনের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অবহেলা করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। ভূগোল, জ্বালানি, ট্রানজিট, সীমান্ত, চিকিৎসা, পানিবণ্টন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের কারণে ভারত বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রেই থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অক্টোবর ২০২৫-এর বাণিজ্য তথ্যেই দেখা যায়, ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো জ্বালানি নির্ভরতা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি সাত মাসে ৭০ শতাংশ বেড়েছিল (মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে আমদানির পরিমাণ ৯.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৪ শতাংশে), এবং একই বছরে আদানি পাওয়ারের একক সরবরাহ
বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৮.২ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের মার্চে রয়টার্স জানায় যে—ভারত বাংলাদেশের রোগীদের জন্য স্বাভাবিক মাত্রার মেডিকেল ভিসা দেওয়া কমিয়ে দিয়েছিল, ফলে চীনের জন্য চিকিৎসা পর্যটন ও নরম কূটনীতির নতুন সুযোগ তৈরি হয়। এদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘Change of Fabric’ বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি গভীর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে জিডিপি ০.৫ শতাংশ এবং রপ্তানি ৩.৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে; আর দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আরও গভীর আঞ্চলিক একীভবন হলে বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধির সম্ভাবনা ১৭.৭ শতাংশ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৭০.৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই সংখ্যাগুলো মনে করিয়ে দেয়—ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো টেকসই আঞ্চলিক কৌশল গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের এই ত্রিমাত্রিক সমীকরণের মধ্যে বাংলাদেশের সামনে যে সবচেয়ে বড় সুযোগটি রয়েছে, তা হলো কৌশলগত ভারসাম্য থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা বের করে আনা। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত রপ্তানি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ পেতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুধুমাত্র কৌশলগত ঝুঁকি সৃষ্টি করছে না; দক্ষ নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিকে প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে কয়েকটি জায়গায় একসঙ্গে শক্তিশালী হতে হবে। প্রথমত, রপ্তানি পণ্যকে পোশাকের গণ্ডি ছাড়িয়ে হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ এবং আইটি সেবায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন্দর, সড়ক, রেল ও কাস্টমস আধুনিকীকরণ করে
লজিস্টিক ব্যয় কমাতে হবে। তৃতীয়ত, ঋণ গ্রহণে সতর্কতা ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে আয় সৃষ্টি করতে পারে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে শ্রম, পরিবেশ ও মাননিয়ন্ত্রণের শর্তগুলো আরও দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে।
চীন থেকে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আসতে হবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য, আর ভারতকে আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি, বাজার ও মানুষের চলাচলের বাস্তব অংশীদার হিসেবে ধরে রাখতে হবে।
মোটকথা, চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফরটি এমন এক মুহূর্তে ঘটছে, যখন বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টায় আছে। ১৮ কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যা, ৫১,০৭১ কোটি ডলারের বেশি বর্তমান মূল্যমান জিডিপি, প্রায় ৪,৮২৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি, ৩,২৮০ কোটি ডলারের রেমিটেন্স এবং তিন বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। এই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কারণ নেই; বরং সঠিক কূটনীতি থাকলে এটিই শক্তিতে
রূপান্তরিত হতে পারে। চীনের বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, ভারতের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সুযোগ একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকবে না, নিজেই একটি আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এই সফরের আসল তাৎপর্য তাই কোনো একক চুক্তিতে নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বার্তায়, যেখানে বাংলাদেশ জানিয়ে দিচ্ছে যে—সে কারও শিবিরে বন্দি হতে চায় না; উন্নয়নের স্বার্থে সব শক্তির সঙ্গে কাজ করে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করতে চায়।

মন্তব্যসমূহ