তেলাপোকা’ বিদ্রোহে মোদির বিদায়ঘণ্টা?

নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

 ফেসবুক মিম থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্দোলনে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে দিল্লির রাজনৈতিক ময়দান। গত সোমবার থেকে ভারতের রাজধানী অনেকটাই 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপির বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার আর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কি নরেন্দ্র মোদি সরকারের পতন ঘটাবে? কেন এই আন্দোলন নিয়ে ভারতজুড়ে তোলপাড়?

ককরোচ আন্দোলন কী, কেন এই বিক্ষোভ?

২০ জুলাই, সোমবার—দিল্লির মূলকেন্দ্র কনট প্লেস, জনপথ আর যন্তর মন্তর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর রোষানলে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস আর পুলিশের বাধার প্রাচীর—কোনো কিছুই আটকাতে পারেনি তাদের। এমনকি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা স্তব্ধ করেও তরুণদের আটকানো যায়নি।


ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মূলত কোনো চিরাচরিত রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি নাগরিক সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের অনুসারী সংখ্যা মাত্র দুই দিনে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছিল—অনলাইন দুনিয়ায় জন্ম নেওয়া এই আন্দোলন বাস্তবে রাজপথে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে?

সোমবারের ঘটনাই সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। ইন্টারনেটে সেন্সরশিপ আর যাতায়াত ব্যবস্থা স্তব্ধ করার পরও হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমে প্রমাণ করেছে, তাদের আর চেপে রাখা সম্ভব নয়। ভারতের স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মা বলেন, ‘এই লড়াই এখন আর শুধু শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, রেকর্ড বেকারত্ব আর ভোট কারচুপির মতো গুরুতর প্রশ্ন।’

সংসদ ভবন অভিযান



গত সোমবার সিজেপি সরাসরি সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দিলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সংঘাত চরমে পৌঁছালে সিজেপি দাবি করে, সরকার তাদের আলোচনার জন্য ডেকেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরাই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল।


জেপি নাড্ডা ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক হয়। তারা লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।’ তবে মূল বিষয় হলো, বৈঠক এবং স্মারকলিপি প্রদান হলেও মোদি সরকার সিজেপির মূল দাবি মেনে নেয়নি। আর সিজেপিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

মঙ্গলবারও সিজেপির বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এদিন বিক্ষোভে যোগ দেয় ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হলে বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। পরে অবশ্য তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।


নতুন রাজনৈতিক তরঙ্গ?


এই আন্দোলনের মূল শক্তি কোথায়—তা নিয়ে বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব যন্তর মন্তরে বলেন, ‘আজ যে নতুন প্রজন্মকে দেখছি, তারা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছে না। তারা লড়ছে একটি স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি এবং এমন এক রাজনীতির জন্য, যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।’

সাংবাদিক স্মিতা শর্মার মতে, এই আন্দোলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো এটি সম্পূর্ণ ‘নেতৃত্বহীন আন্দোলন’। মেট্রো বন্ধ ছিল, ইন্টারনেট ছিল না, সিজেপি নেতারা কোনো বার্তা পাঠাতে পারছিলেন না; তবুও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ দায়িত্বে রাস্তায় নেমে এসেছে। পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করেও তারা পিছু হটেনি।

মোদি সরকারের লাল সংকেত


প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রি এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মোদি সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকার ভেবেছিল জনগণকে রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যস্ত রাখা যাবে, কিন্তু এই আন্দোলন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। হেমন্ত অত্রি আরও বলেন, ‘সরকার হয়তো ভেবেছিল তারা সব সময় ধর্মীয় রাজনীতি চালিয়ে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু এই তরুণরা প্রমাণ করে দিয়েছে—জনগণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা, চাকরি আর রুটি-রুজির মতো বাস্তব ইস্যুতে ফিরে আসবেই।’

দিল্লির রাস্তায় আজ যে যুবশক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা আগামী দিনে ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে। যুবসমাজ যখন পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়, তখন বুঝতে হবে ক্ষোভের মাত্রা অনেক গভীরে। সরকার এই তরুণদের দাবি উপেক্ষা করলে এই ‘ককরোচ আন্দোলন’ সামনে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বরিশালে ‘হানিট্র্যাপ চক্রের’ তরুণীসহ গ্রেপ্তার ২

ডাকসু নির্বাচন: কে হবেন ভিপি, কে হবেন জিএস? জানা গেলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম

প্রতি বছর ৫০০ কোটি কন্ডোম তৈরি করে এই সংস্থা। কিন্তু হরমুজ বন্ধে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে লাটে ওঠ