দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে মাদারীপুরের শকুনি লেক, কাঁচাবাজারে বাড়ছে যানজট


প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মাদারীপুরের একমাত্র বিনোদন ও দর্শনীয় স্থান শকুনি লেক। প্রকৃতিপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকলেও এখন দখল, অপরিকল্পিত কাঁচাবাজার, যানজট ও দূষণের কারণে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার নান্দনিক সৌন্দর্য। লেকপাড়ের মনোরম পরিবেশের পরিবর্তে এখন চোখে পড়ে অস্থায়ী দোকান, বাজারের বর্জ্য, ভাঙাচোরা অবকাঠামো ও তীব্র যানজট।


শকুনি লেকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৪ সালে প্রায় ১৮ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে মাদারীপুর পৌরসভা। প্রকল্পের আওতায় লেকের চারপাশে হাঁটার জন্য দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, শান্তি ঘাটলা, কৃত্রিম ঝর্ণা, স্বাধীনতা অঙ্গন, শহিদ কানন চত্বর 

, বসার স্থান, মাদারীপুর ঘড়ি (ওয়াচ টাওয়ার), শিশু পার্ক, আলোকসজ্জাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং লেকপাড়ে অবৈধভাবে কাঁচাবাজার গড়ে ওঠায় কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলায় ওয়াকওয়ের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও আগাছা ও ছোট ছোট ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে হাঁটার পথ। অনেক স্থানে লেকের পাড় অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাজারের বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা লেকের আশপাশে ফেলায় পানির রং পরিবর্তিত হয়েছে এবং পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।


শকুনি লেকের পূর্বপাশে পুলিশ লাইন থেকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল অস্থায়ী কাঁচাবাজার। সেখানে অন্তত শতাধিক দোকানে প্রতিদিন সবজি, কাঁচামাল, মাছ, ফল, মুদি পণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লেকের চারপাশে প্রায় দুই শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকানও রয়েছে। কিছুদিন আগে পৌরসভার উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান উচ্ছেদ করা হলেও কাঁচাবাজার এখনো বহাল রয়েছে।

সবজি বিক্রেতা আব্দুল মোতালেব বলেন, “চার বছর ধরে এখানে রাস্তার ওপর ব্যবসা করছি।”

ফল বিক্রেতা রুবেল খান বলেন, “আমি তিন বছর ধরে এখানে মৌসুমি ফল বিক্রি করি। এখানে ব্যবসা করতে কাউকে কোনো টাকা দিতে হয় না।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিনয়, রাশেদ, সাব্বির, কাবুল ফকিরসহ শতাধিক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে ওই সড়কের ওপর সবজি, ফল, কাঁচামালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করছেন।

পুলিশ লাইনের দেয়াল ঘেঁষে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তি মুদি ও চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন। পাশেই রয়েছে আসাদ নামে এক ব্যক্তির বিকাশ ও মোবাইল রিচার্জের দোকান। এ ছাড়া মুদি, ফ্লেক্সিলোড, কাঁচামাল ও ফলের একাধিক অস্থায়ী দোকান দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ এক বছর, কেউ চার থেকে ছয় বছর, আবার কেউ প্রায় এক দশক ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন।


স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় হাসান বলেন, “আমি নিয়মিত এখান থেকে বাজার করি। কিন্তু এটি জেলা সদর হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী, স্বজন ও অ্যাম্বুলেন্স এই পথ ব্যবহার করে। রাস্তার ওপর বাজার বসার কারণে প্রায়ই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে জরুরি রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।”


সাংবাদিক বেলাল রিজভী বলেন, “পুলিশ লাইন থেকে হাসপাতালের মোড় পর্যন্ত অন্তত শতাধিক ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকান রয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। এখান দিয়ে জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। রাস্তার ওপর বাজার বসার কারণে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে পৌরসভার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শকুনি লেকের সৌন্দর্যও দিন দিন নষ্ট হচ্ছে।”


জিতু আলম বলেন, "লেকপাড়ে এখন দুই ধরনের মানুষ বেশি দেখা যায়, রেস্টুরেন্টে খেতে আসে একদল আরেক দল আসে বাজার করতে, দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম । দিন দিন শকুনি লেকের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। তদারকি না থাকার কারণেই এই অবস্থা"। 


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন বাজারের বর্জ্য লেকের আশপাশে ফেলা হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে লেকের পানির মানও নষ্ট হচ্ছে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশ লাইন থেকে হাসপাতালের মোড় পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুর পৌরসভার প্রশাসক জেসমিন আক্তার বানু প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও পরে বলেন, “বাজার আমি বসাইনি। ওটার দায়িত্ব আমার না।”

অন্যদিকে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, “লেক পার্ক মানুষের সৌন্দর্য উপভোগের স্থান। সেখানে বাজার বসার কোনো সুযোগ নেই। বাজারের বর্জ্যে লেকের পরিবেশ ও পানির মান নষ্ট হচ্ছে। খুব শিগগিরই লেকপাড়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনোভাবেই লেকের সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেওয়া হবে না।”

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বরিশালে ‘হানিট্র্যাপ চক্রের’ তরুণীসহ গ্রেপ্তার ২

ডাকসু নির্বাচন: কে হবেন ভিপি, কে হবেন জিএস? জানা গেলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম

প্রতি বছর ৫০০ কোটি কন্ডোম তৈরি করে এই সংস্থা। কিন্তু হরমুজ বন্ধে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে লাটে ওঠ