এটা মানসিক রোগ না হলেও আচরণগত আসক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


 জীবনযাত্রায় সুস্থ আবেগ ও জৈবিক তাড়না স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে এই সহজাত অনুভূতি যখন অবাধ্য ও নিয়ন্ত্রণহীন মানসিক আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা জীবনের স্বস্তি কেড়ে নেয়।


চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় তীব্র যৌন চিন্তা, অনিয়ন্ত্রিত ফ্যান্টাসি এবং বাধ্যতামূলক আচরণের এই বিশেষ অবস্থাকে ‘হাইপারসেক্সুয়ালিটি’ বা ‘অতি-কামাসক্তি’ বলা হয়।


পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২ শতাংশ মানুষ এই ধরনের আচরণগত জটিলতায় ভুগে থাকেন।

হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যদিও এটি মানসিক রোগের তালিকায় সরাসরি রোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়, তবে এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক কুফলগুলো অবহেলা করলে, পেশাজীবন, অর্থ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্থায়ী ক্ষতি সাধন করতে পারে।


এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা সাংবাদিক ওয়েন্ডি উইসনার এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের বোর্ড-প্রত্যয়িত ‘ফরেনসিক সাইক্রিয়াটিস্ট’ ডা. মাইকেল ম্যাকআইনটায়ার।


অতি-কামাসক্তি বা হাইপারসেক্সুয়ালিটির প্রধান ৩ লক্ষণ

অনেকেই সাধারণ বা উচ্চ কামেচ্ছা ও হাইপারসেক্সুয়ালিটির মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে পারেন না। চর্মরোগ ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩টি প্রধান লক্ষণের মাধ্যমে এটি চেনা সম্ভব।


নিয়ন্ত্রণহীন তীব্র ফ্যান্টাসি: সারাক্ষণ মাথার কোষে অবাধ্য যৌন চিন্তা কাজ করা, যা দৈনন্দিন সাধারণ কাজে বা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।


বাধ্যতামূলক পর্নোগ্রাফি বা মাস্টারবেইশন: পর্নোগ্রাফি দেখা বা হস্তমৈথুনের মতো অভ্যাসগুলো যখন আনন্দের জন্য নয়, বরং শুধুই এক ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক ও অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ দূর করার বাধ্যবাধকতা থেকে করা হয়।

তীব্র অপরাধবোধ ও লজ্জা: সাময়িক তাড়না মেটার পরপরই নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা, মানসিক অবসাদ, একাকিত্ব এবং অপরাধবোধ জেগে ওঠে, যা মানসিক স্বাস্থ্যকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।


হাইপারসেক্সুয়ালিটি বা অতি-কামাসক্তির ৪টি সম্ভাব্য কারণ


বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এর পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত কারণ লুকিয়ে থাকে:

মানসিক ব্যাধি ও বাইপোলার ডিজঅর্ডার: ডা. মাইকেল ম্যাকআইনটায়ার বলেন, “হাইপারসেক্সুয়ালিটি মূলত তীব্র ‘ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেইশন’ বা উদ্বেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে ‘বাইপোলার ডিজঅর্ডার’ নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ‘ম্যানিয়া’ বা অতি-উত্তেজনার প্রধান একটি চিকিৎসাগত উপসর্গ হল এই ‘হাইপারসেক্সুয়ালিটি’।


আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হীনতা: মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শৈশব তীব্র মানসিক ‘ট্রমা’ বা দুঃখ বা প্রতিকূলতার

মধ্য দিয়ে কাটে, তাদের মস্তিস্কের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বা আবেগীয় আত্ম-নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই অনেকটাই ধীর হয়ে যায়।


ফলে জীবনের যেকোনো কঠিন মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে বা বাস্তবতাকে এড়াতে মস্তিস্ক এই ক্ষতিকর আসক্তিকে ভুলবশত এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়।

আচরণগত আসক্তি বা বিহেভিওরাল অ্যাডিকশন: মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে- মাদকাসক্তি বা অ্যালকোহল ব্যবহারের সময় মস্তিস্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ বা পুরষ্কার পাওয়ার অনুভূতিতে যেভাবে ডোপামিন হরমোনের তীব্র উত্থান ঘটে, অতি-কামাসক্তির সময়ও মগজের কোষে ঠিক একই ধরনের রাসায়নিক বিকৃতি ঘটে।


তাই একে অনেক সময় ‘বিহেভিওরাল অ্যাডিকশন’ বা আচরণগত আসক্তিও বলা হয়।


নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ব্যবস্থা

এই আসক্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়ার জন্য ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি)’ এবং ‘রিল্যাপস প্রিভেনশন থেরাপি’ ভালো কাজ করে।


পাশাপাশি চিকিৎসকেরা অনেক সময় বিষণ্ণতা কমানোর ‘অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট’ বা নির্দিষ্ট ‘এসএসআরআই’ ঘরানার ওষুধ দিয়ে থাকেন, যা কোনো জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।


বিশেষজ্ঞদের পরামমর্শ

হাইপারসেক্সুয়ালিটি’ কোনো স্থায়ী চারিত্রিক কদর্যতা বা পাপ নয়, এটি মূলত মস্তিস্কের এক ধরনের চিকিৎসা-গত ও আচরণগত জটিলতা। তাই গোপন রেখে, লোকলজ্জা বা লজ্জাবোধের সাগরে ডুবে না গিয়ে, অবিলম্বে একজন নিবন্ধিত সাইকোথেরাপিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সরাসরি পেশাদার নির্দেশিকা নেওয়াই এই চক্র থেকে বের হয়ে আসার পন্থা হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বরিশালে ‘হানিট্র্যাপ চক্রের’ তরুণীসহ গ্রেপ্তার ২

প্রতি বছর ৫০০ কোটি কন্ডোম তৈরি করে এই সংস্থা। কিন্তু হরমুজ বন্ধে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে লাটে ওঠ

সোমবার বরিশাল সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী