জুলাইয়ের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা
![]() |
| হামলার দিনে সোশাল মিডিয়া থেকে নেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ভিডিওর স্ক্রিনশট। ছবি: রয়টার্স |
মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণ উপকূলে হামলা চালাচ্ছে এবং ইরানও আঞ্চলিক বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা গোলাবর্ষণ করছে। ফের পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় আছে প্রতিবেশী দেশগুলো।
গত জুলাই মাসের পর বুধবার তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ইরান ও এর আরব প্রতিবেশী দেশগুলো আবার যুদ্ধের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণ উপকূলে হামলা চালাচ্ছে এবং ইরানও ওই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা গোলাবর্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র আরও বিধ্বংসী হামলার হুমকি দিয়েছে। ইরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে, যেখানে চারজন নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে এই সংঘাতের পর এশিয়ান এবং ইউরোপীয় শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে, যা তেলের দামকে আবার এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যা গত জুলাই মাসের পর আর দেখা যায়নি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার সিস্টেম, সামুদ্রিক সম্পদ, মাইন বিছানোর
সক্ষমতা এবং যোগাযোগকেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছে। ওদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে।
প্রণালির তীরবর্তী সিরিক কাউন্টির ৩৮ বছর বয়সী এক পৌরসভা কর্মী মাহমুদ টেলিফোনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "গত রাতটি মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর শেষ দিন।” তিনি ওই এলাকায় হওয়া হামলার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, যার মধ্যে সেই শহরটিও আছে, যেখানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরান এর জবাবে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা জায়গাগুলোতে আঘাত হেনেছে। ইরান বলেছে, তাদের লক্ষ্য হল, পশ্চিম এশিয়াজুড়ে কয়েক দশক ধরে দখল করে রাখা সামরিক ঘাঁটির বিশাল নেটওয়ার্ক থেকে মার্কিন বাহিনীকে তাড়িয়ে দেওয়া।
“এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনও অপকর্মের জবাব দেওয়া হবে আরও কঠোর, ব্যাপক এবং ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। যে দেশই আক্রমণাত্মক মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করবে, তাকে অবশ্যই এর বিপজ্জনক পরিণতি মেনে নিতে হবে”, বলেছে ইরানের সামরিক কমান্ড।
ইরান বলেছে, তারা জর্ডান এবং উত্তর ইরাকের ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের হত্যা করেছে, কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ইরান জানিয়েছে, কুয়েতে তারা বিশালকায় মার্কিন আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং একজন মার্কিন কমান্ডারের আবাসনকে নিশানা করেছে। অন্যদিকে, কুয়েতের দমকল বিভাগ জানিয়েছে, ড্রোন হামলার শিকার হওয়া একটি আবাসিক কমপ্লেক্সের আগুন তারা নিভিয়ে ফেলেছে।
কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটি আছে। কাতার হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে এবং এর পাল্টায় যা যা ঘটবে তার জন্য ইরানই দায়ী থাকবে বলে জানিয়েছে।
ওদিকে, বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান দপ্তর আছে। বাহরাইন জানিয়েছে যে, ইরান থেকে আসা ড্রোনগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে আটকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন কর্মীদের পরিচালিত দুটি ট্যাংকারে মাইন দিয়ে হামলা করেছে।
তবে ওয়াশিংটন বলেছে, ইরানের হামলার পরও তারা প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করছে। জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, সোমবার ১৭ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার কারণে যুদ্ধ আবার পুরোদমে শুরুর সংকেত মেলায় আশঙ্কায় আছে ইরানিরা।
ইরানের দক্ষিণের বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের ২৮ বছর বয়সী নারী মাহপারি রয়টার্সকে ফোনে বলেন, “এভাবে বেঁচে থাকা খুব কঠিন। আমরা জানি না যুক্তরাষ্ট্র কখন হামলা করবে। আমার পরিবার এবং আমি ক্রমাগত দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি যে হামলাটি কোথায় হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের রাতের হামলায় ইরানে কমপক্ষে ১২ জন মারা গেছে। এর মধ্যে সিরিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় ৪ বছরের এক শিশুসহ ৪ জন প্রাণ হারিয়েছে।
এই হামলার বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র, ইউ.এস. নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, “ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম থেকে ছড়ানো প্রতিবেদনের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি’র মতো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না।”
তবে ইরানের ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সির ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, হামলা হওয়া বাড়িটির ঘর ও উঠানে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রক্তে ভেজা একটি কার্পেটের ওপর নারীদের পোশাক ও স্যান্ডেল পড়ে রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নতুন এই সংঘাত জুলাই মাসের পর থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে দুই সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণ হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প তার সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কর্মকর্তারা তখন সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, যুদ্ধাস্ত্র শেষ হয়ে আসছে এবং লক্ষ্যবস্তু করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থান আর বাকি নেই।

মন্তব্যসমূহ