শ্রীকৃষ্ণ: পরম সখা, পরম নির্ভয়

 

ননীচোরা গোপাল থেকে কালীয়দমনকারী বীর, আর কুরুক্ষেত্রের অনমনীয় পার্থসারথি—একই অবয়বে শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত লীলা ও পরম আশ্রয়ের রূপচিত্র।

কুরুক্ষেত্রের মহাবিনাশী রক্তপাতের দায় কি শুধুই কৃষ্ণের? রণকুশলী কূটনীতিবিদ নাকি বিপদের পরম আশ্রয়—মহাভারতের ক্যানভাসে কে এই শ্রীকৃষ্ণ?

কুরুক্ষেত্রের মহাবিনাশী রক্তপাত আর রাজনীতি দেখে যুগে যুগে অনেকেই কৃষ্ণকে ওই যুদ্ধের মূল অনুঘটক হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তবে শুধু রণকুশলী রাজনীতিক হিসেবে দেখলে কৃষ্ণের চরিত্রকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায় না। মহাভারতের বিশাল ক্যানভাসে তিনি শুধু এক কঠোর রণকুশলী নন, তিনি সম্পর্কের এক অবিচল আশ্রয়। অর্জুনের সখা হয়ে রথের রাশ হাতে নেওয়া, নিঃসঙ্গ দ্রৌপদীর অপমানে পরম ভরসা হয়ে দাঁড়ানো এবং জীবনের সবচেয়ে জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে নির্ভয় দেওয়ার নামই শ্রীকৃষ্ণ।

প্রচলিত ধারণা মতে শ্রীকৃষ্ণকে এভাবে চেনা যায়—প্রধানত তার গায়ের রং ঘন নীল। তার রেশমি ধুতিটি সাধারণত হলুদ রঙের এবং মাথার মুকুটে একটি ময়ূরপুচ্ছ শোভা পায়। কৃষ্ণের প্রচলিত বিগ্রহগুলোতে সাধারণত তাকে বংশীবাদনরত এক বালক বা যুবকের বেশে দেখা যায়। তার একটি পা অপর পায়ের ওপর ঈষৎ বঙ্কিম অবস্থায় থাকে এবং বাঁশিটি তার ঠোঁট পর্যন্ত ওঠানো থাকে। তাকে ঘিরে থাকে গরুর দল; এটি তার দিব্য গোপালক (গোবিন্দ) সত্তার প্রতীক। কোনো কোনো চিত্রে তাকে প্রেয়সী রাধাসহ গোপী-পরিবৃত অবস্থাতেও দেখা যায়। রাধা হলেন কৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তি। বিকল্পভাবে, তাকে গোপীদের সঙ্গে এক ভাবোদ্দীপক বালক হিসেবে দেখা যায়, যিনি প্রায়শই গান রচনা বা কৌতুক করেন।

কৃষ্ণের অপর একটি পরিচিত চিত্র হলো কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ভগবদ্গীতায় অর্জুনকে পরমার্থ উপদেশ দেওয়ার ছবি। এই চিত্রে তার যে বিশ্বরূপ দর্শিত হয়, তার অনেকগুলো বাহু ও মাথা। এর মধ্যে সুদর্শনচক্রধারী বিষ্ণুর একটি ছায়া বিদ্যমান। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অঙ্কিত একটি গুহাচিত্রে অশ্বচালিত রথ চালনার চিত্র আছে; সেই চিত্রে একটি চরিত্র রথের চাকা ছুঁড়তে উদ্যত। এই চরিত্রটিকে কৃষ্ণ বলে অভিহিত করা হয়।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিখ্যাত চিত্রে তাকে একজন সারথি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে তিনি পাণ্ডব রাজপুত্র অর্জুনকে সম্বোধন করছেন। প্রতীকীভাবে এটি হিন্দুধর্মের একটি গ্রন্থ 'ভগবদ্গীতা'র বর্ণনাকে ইঙ্গিত করে। এই জনপ্রিয় চিত্রগুলোতে অর্জুনের পরামর্শদাতা হিসেবে বা রথের চালক হিসেবে কৃষ্ণ সম্মুখে সারথি হিসেবে উপস্থিত হন, যখন অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে তীর দ্বারা লক্ষ্য স্থির করতে প্রস্তুত হন।


শুরুতে বলেছিলাম, মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য কৃষ্ণকে দায়ী করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমার মতে তিনিই মহাভারতের সেরা চরিত্র। বাল্যকালের প্রেম, কৈশোরের লীলা আর যৌবনের রাজত্বের পর পরম আশ্রয়ের এক নির্ভয় সারথি।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। দ্রৌপদীর বয়স যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে তখন। ঘর থেকে বের হন না তিনি। এমন এক সময় তার সখা শ্রীকৃষ্ণ গিয়েছিলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। দ্রৌপদী জানতে চেয়েছিলেন, এই যুদ্ধ, এই মৃত্যু, এই বিভীষিকার জন্য কি তবে তিনিই দায়ী?

কৃষ্ণ উত্তর দিয়েছিলেন এই বলে, “নিজেকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করো না দ্রৌপদী। তুমি তেমন কেউ নও। তবে তোমার তিনটি ভুল এই যুদ্ধের কারণ— ১) স্বয়ংবর সভায় তুমি যদি সব সত্য না জেনে কর্ণকে সূতপুত্র বলে ফিরিয়ে না দিতে, হয়তো কাহিনি ভিন্ন কিছু হতো। ২) পাণ্ডবেরা যখন তোমাকে নিয়ে গৃহে ফিরে এসেছিল, তোমাকে না দেখেই কুন্তী মাতা ভাগ করে নিতে বলেছিলেন। সেদিন যদি তুমি যুক্তি দিয়ে তোমার মত তুলে ধরতে, তাহলেও পরিস্থিতি অন্য কিছু হতে পারত। ৩) দুর্যোধনকে ‘অন্ধের পুত্র অন্ধ’ বলে ভর্ৎসনা না করলে হয়তো তোমার বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটত না।”


এই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ, যিনি কর্মফলের অধিকার থেকে কাউকে দূরে রাখেন না বলেই হয়তো দ্রৌপদীকেও এসব কথা বলেছিলেন ঘটনা ঘটে যাবার পর।

কে আসলে তিনি? জন্মেছিলেন রাজা কংসের কারাগারে, যে তাকে হত্যা করার জন্য একপায়ে খাড়া। সে কারাগার থেকে গিয়ে বড় হলেন যশোদার ঘরে। কৈশোর-যৌবনে গোপীদের ভালোবাসা আর রাধার প্রেমে মাতোয়ারা ইনি পুরো বদলে গেলেন মহাভারতে।


এবার তিনি সারথি। এই চরিত্রটি অনন্য। ছলে-বলে-কৌশলে পাণ্ডবদের জয়ী করেছেন। তা না হলে পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্য আর কর্ণকে বধ করা ছিল অসম্ভব। বিশেষত কর্ণকে বারবার নিয়তির নামে হারিয়ে দেওয়া এখনো বুকে লাগে।

যুদ্ধকৌশলের জন্য তাকে যতটা ভালোবাসি, তার চেয়ে ঢের বেশি ভালোবাসি দুটো কারণে। তিনি না হলে দ্রৌপদীর লজ্জা ও বস্ত্রহরণ হতো কলঙ্কময় ইতিহাস। আর একটি কারণ, শাস্ত্রমতে ভগবান হবার পরও নতমস্তকে মেনে নিয়েছিলেন গান্ধারীর অভিশাপ। নিজ বংশ নির্মূল হবার সে অভিশাপ মেনে নেওয়া মানে পুত্রহারা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। এখানেই তিনি অনন্য।


আমার চোখে তিনি এক বিস্ময়-চরিত্র। মহাভারত ও ধর্মযুদ্ধ ব্যতীত যিনি আসলে অজানা-অচেনা এক চরিত্র। শরশয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্ম। অজস্র তীরে গাঁথা তার শরীর। টপটপ করে পড়া রক্তধারায় ভেসে যাচ্ছিল মাটি। আকাশের দিকে তাকিয়ে অতীতের কথা মনে করছিলেন পিতামহ। সোনার সাম্রাজ্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, বিদুর, কুন্তী, মাদ্রী, দ্রৌপদী সেলুলয়েডের ছবির মতো একে একে ভেসে উঠছিল তার মানসপটে।

পরমধ্যায়ী, বীর যোদ্ধা, প্রতিজ্ঞায় অটল এই মানুষটি যেকোনো কিছুই আগেই টের পেয়ে যান। আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে দূরগামী পথের দিকে তাকালেন তিনি। আবছা আলোয় খালি গা, ধুতি পরিহিত এগিয়ে আসা মানুষটিকে তিনি ভালোবাসেন। জীবন ও শাস্ত্রের নিয়মে অনেক কিছু মেনে নিলেও তিনি পাণ্ডবদের ভালোবাসতেন। অন্নপাপের ভয়ে দুর্যোধন ও রাষ্ট্রের পক্ষে থাকলেও তার হৃদয়ে থাকতো এরা।


ধীরে ধীরে সেই দীর্ঘ ছায়াটি তার পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। রক্তে ভেজা পা দুখানি বুকে চেপে ধরেছেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। রক্তে তার বুক ভেসে যাচ্ছে, চোখের জল ও রক্ত মিলে সে এক অন্য স্রোতধারা।


পিতামহের ইশারায় তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন যুধিষ্ঠির। ঠান্ডা গলায় ব্যথাকাতুর ভীষ্ম তাকে কিছু উপদেশ দিলেন, রাজ্য শাসনের কিছু পরামর্শ।

ভেজা কণ্ঠে যুধিষ্ঠির বারবার বলতে লাগলেন, “এই যুদ্ধ, এই মৃত্যু, এই লাশের সারি, স্বজনের মুখ, বিধবা নারীদের দেখতে চাইনি আমি। আপনি আমাদের মার্জনা করবেন হে পিতামহ।”


চোখ মুদে ফেলার আগে বিষণ্ণ কণ্ঠে পিতামহ ভীষ্ম বললেন, “তোমরা কৌরব ও পাণ্ডবেরা ভাইয়ে ভাইয়ে মিলেই এই যুদ্ধ করলে। অধর্ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমাদের জয় হয়েছে। স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ সঙ্গে ছিলেন তোমাদের, কে ঠেকাতে পারত তোমাদের জয়রথ? কিন্তু এটাও ঠিক, ভারতে তোমরা যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সূচনা করে দিলে, তার আগুন হয়তো চিরকালই জ্বলতে থাকবে।”

ভগ্নহৃদয়ে নতমস্তকে কুরুক্ষেত্র ত্যাগ করছিলেন একা, নিঃসঙ্গ যুধিষ্ঠির। যিনি জানতেন, তিনি ও ভীষ্ম ব্যতীত আর কেউই এটি জানে না, জানবে না—তার ছায়ার অদূরে দাঁড়িয়ে একটি শ্যাম ছায়ামূর্তি নীরবে সরে দাঁড়িয়েছিল, একহাতে যার বাঁশের বাঁশরি আর অন্য হাতে রণতূর্য।


বহুবার বহু ছলে তিনি আমাদের যেসব পাঠ দিয়ে গেছেন তা অমূল্য। বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ-সংগ্রাম আর অধর্মের বাড়াবাড়ি দেখলে তাকে স্মরণ করার বিকল্প থাকে না। এই কৃষ্ণ আমাদের শুধু আরাধ্য দেবতা নন, তিনি আমাদের বাঁচার এক প্রেরণা। যে কারণে আমরা বিশ্বাস করি, যখনই কোনো স্থানে, দেশে বা সমাজে অধর্মের প্রাবল্য হয়, তখন সেখানে তিনি আবির্ভূত হন। হয়তো সহজ খালি চোখে বোঝা যায় না, দেখা যায় না; কিন্তু তিনি নীরবে এসে দাঁড়াবেন—এটাই সত্য।

ননীচোরা গোপাল থেকে কালীয়দমনকারী বীর, আর কুরুক্ষেত্রের অনমনীয় পার্থসারথি—একই অবয়বে শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত লীলা ও পরম আশ্রয়ের রূপচিত্র।

কারণ, তিনিই পিতা, তিনিই মাতা, তিনিই পরম বন্ধু:


ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব,


ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।


ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব,


ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব॥


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বরিশালে ‘হানিট্র্যাপ চক্রের’ তরুণীসহ গ্রেপ্তার ২

প্রতি বছর ৫০০ কোটি কন্ডোম তৈরি করে এই সংস্থা। কিন্তু হরমুজ বন্ধে পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে লাটে ওঠ

সোমবার বরিশাল সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী